রমজানের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কাজ
আমরা অনেকেই জানি না, এই পবিত্র মাসে ঠিক কোন কোন কাজগুলো করা উচিত। বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং মুফতিদের কন্টেন্টগুলো রিসার্চ করে, রমজানের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি লিস্ট তৈরি করেছি।
এই পোস্টটি আপনার পুরো রমজান মাসের গাইডলাইন হতে পারে, তাই অবশ্যই Save করে রাখুন এবং প্রতিদিন মিলিয়ে দেখুন।
রমজান মাসের ৩০টি দিনের জন্য ৩০টি আমলঃ
ক্যাটাগরি ১: কোর ইবাদাত (Core Worship)
১. সিয়াম পালন করা: ঈমান ও একনিষ্ঠতার সাথে, শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য রোজা রাখুন। এটাই এই মাসের প্রধান আমল।
২. সময়মতো সালাত আদায়: পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত সময়মতো আদায় করুন। এটা জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।
৩. ধীরস্থিরভাবে তারাবীহ আদায়: ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় তারাবীহর সালাত পড়ুন। চেষ্টা করুন ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত পড়ার, এতে সারারাত ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়।
৪. তাহাজ্জুদ সালাত পড়া: সাহরীর জন্য যখন উঠবেনই, তখন কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করুন। ফরজ সালাতের পর এটাই সর্বোত্তম সালাত।
ক্যাটাগরি ২: কুরআনের সাথে সম্পর্ক (Relationship with the Quran)
৫. সহীহভাবে কুরআন শেখা: এই মাসেই কুরআন নাজিল হয়েছে। তাই শুদ্ধভাবে কুরআন শেখার জন্য এর চেয়ে উত্তম সময় আর হয় না।
৬. অপরকে কুরআন শেখানো: নিজে যা শিখেছেন, পরিবারের বা বন্ধুদের মধ্যে অন্তত একজনকে শেখানোর চেষ্টা করুন। কারণ শ্রেষ্ঠ মানুষ তো সেই, যে নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।
৭. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত: এই মাসে নবীজি (সাঃ) অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে অনেক বেশি তিলাওয়াত করতেন। প্রতিটি হরফের জন্য ১০টি করে নেকি রয়েছে।
৮. একজন অপরজনকে কুরআন শুনানো: সাহাবীরা একে অপরকে কুরআন শোনাতেন। আপনিও আপনার বন্ধু বা পরিবারের সদস্যের সাথে এই আমলটি করতে পারেন।
৯. কুরআন বোঝা ও আমল করা: শুধু তিলাওয়াত নয়, প্রতিদিন অর্থসহ পড়ুন এবং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করুন।
১০. কুরআন হিফয করার চেষ্টা: প্রতিদিন একটি করে আয়াত মুখস্থ করার লক্ষ্য নিন। মাস শেষে ৩০টি নতুন আয়াত আপনার মুখস্থ হয়ে যাবে।
ক্যাটাগরি ৩: আত্মশুদ্ধি ও ব্যক্তিগত আমল (Self-Purification & Personal Deeds)
১১. ইখলাস বা একনিষ্ঠতা অর্জন: যেকোনো আমল করুন শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, মানুষ দেখানোর জন্য নয়।
১২. আল্লাহর শুকরিয়া আদায়: রমজান মাস পাওয়ার জন্য এবং প্রতিটি ইবাদতের সুযোগের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন।
১৩. তাওবাহ ও ইস্তেগফার করা: গুনাহ মাফের এই সেরা সময়ে sincerly আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। দিনে অন্তত ১০০ বার ইস্তেগফার করার অভ্যাস করুন। সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার পড়ার চেষ্টা করুন।
১৪. তাকওয়া অর্জন করা: তাকওয়া মানে আল্লাহর ভয়ে সব রকম পাপ থেকে দূরে থাকা। রোজা আমাদের এই তাকওয়া অর্জনেরই শিক্ষা দেয়।
১৫. বেশি বেশি দো‘আ ও কান্নাকাটি করা: ইফতারের আগের মুহূর্তটি দোয়া কবুলের অন্যতম সেরা সময়। এই সময় আল্লাহর কাছে নিজের চাওয়াগুলো তুলে ধরুন।
১৬. আল্লাহর যিকর করা: চলতে-ফিরতে, কাজেকর্মে মুখে আল্লাহর যিকর জারি রাখুন (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার)।
১৭. নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও সুন্দর চরিত্র গঠন: রোজা রেখে মিথ্যা, গীবত, ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন। কেউ ঝগড়া করতে এলেও বলুন, “আমি রোজাদার”।
১৮. মিসওয়াক করা: এটি নবীজি (সাঃ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ, যা মুখের পবিত্রতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ।
ক্যাটাগরি ৪: দান ও আন্তরিকতা (Charity & Sincerity)
১৯. বেশি বেশি দান-সদাকাহ করা: নবীজি (সাঃ) এই মাসে সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন। আপনার সাধ্যমতো প্রতিদিন কিছু না কিছু দান করুন। যাকাত দেওয়ার জন্যেও এটি শ্রেষ্ঠ মাস।
২০. ইফতার করানো: প্রতিদিন অন্তত একজন রোজাদারকে ইফতার করানোর চেষ্টা করুন, এতে আপনি তার রোজার সমান সওয়াব পাবেন।
২১. অপরকে খাদ্য খাওয়ানো: শুধু ইফতার নয়, সাহরীতে বা অন্য সময়েও গরীব-দুঃখীকে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
২২. আত্মীয়তার সম্পর্ক উন্নীত করা: যাদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের সাথে সম্পর্ক ঠিক করার জন্য এটিই সেরা সময়। অন্তত একটি ফোন কল বা সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিন।
ক্যাটাগরি ৫: রমজানের বিশেষ আমল (Special Deeds of Ramadan)
২৩. সাহরী খাওয়া: সাহরীতে বরকত রয়েছে। তাই কষ্ট হলেও একেবারে সাহরী বাদ দেবেন না, এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরীর নিয়ত করুন।
২৪. সময়মতো ইফতার করা: সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করুন, দেরি করবেন না। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নাহ।
২৫. ই‘তিকাফ করা: সম্ভব হলে রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ই‘তিকাফ করুন। এটি নবীজি (সাঃ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
২৬. লাইলাতুল কদর তালাশ করা: শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ুন: “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।”
২৭. ফিতরাহ দেয়া: ঈদের সালাত আদায়ের আগেই পরিবারের সবার পক্ষ থেকে ফিতরাহ আদায় করুন।
২৮. ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে থাকা: ফজরের সালাতের পর মাসজিদে অবস্থান করে যিকর ও তিলাওয়াত করুন এবং সূর্যোদয়ের পর দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। এতে পরিপূর্ণ হজ ও উমরার সওয়াব পাওয়া যায়।
২৯. দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করা: আপনার বন্ধু বা পরিবারকে ভালো কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। একটি ভালো কথা বলাও সদাকাহ।
৩০. সামর্থ্য থাকলে উমরা পালন করা: এই মাসে একটি উমরা পালন করা নবীজি (সাঃ)-এর সাথে হজ করার সমতুল্য।
BONUS:
রমজানে যে ৪টি কাজ বেশি বেশি করবেনঃ
নবীজি (সাঃ) রমজানে ৪টি কাজ বেশি বেশি করতে বলেছেন। দুটি আল্লাহর জন্য, আর দুটি আমাদের নিজেদের জন্য।
আল্লাহর জন্য:
১. কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বেশি বেশি পড়া।
২. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা।
নিজেদের জন্য:
৩. আল্লাহর কাছে জান্নাত চাওয়া।
৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া।
রমজানে যা যা এড়িয়ে চলবেনঃ
– অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় শেষ দশ দিন নষ্ট করা।
– ইফতারের পর বেহুদা গল্প বা টিভি দেখে রাত জাগরণ করা।
– অধিক ঘুমিয়ে বা অলসভাবে দিন কাটানো।
– মিথ্যা বলা, গীবত করা বা অন্য পাপ কাজে লিপ্ত থাকা।
– অশ্লীল সিনেমা, নাটক বা গান শোনা।
– খাবারের অপচয় করা।
নবীজি (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাস পেলো, অথচ তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই দুর্ভাগাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।
















