কোচিং-বাণিজ্যের ছায়ায় অস্তমিত শৈশব
শিশুমনকে রঙিন স্বপ্নে ভরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থা আজ বাণিজ্যের নিগড়ে আবদ্ধ। শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ঊর্ধ্বে থেকে গড়ে উঠেছে স্বেচ্ছাচারীর মতো। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হওয়া শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম মাত্র দুই-আড়াই ঘন্টায় সমাপ্ত হয়, আর তখনই শুরু হয় একটি অদৃশ্য ও নিষ্ঠুর শিক্ষাব্যবস্থার নতুন অধ্যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর শিশুরা বিভাজিত হয় দুটি ধারায়। কেউবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দিকে ধাবিত হয়, আবার কেউবা ফিরে যায় সেই একই প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেট বা কোচিং সেন্টারে। সারাদিনব্যাপী এই শিক্ষার নামে বাণিজ্যের চক্রে আবদ্ধ হয় কোমলমতি শিশুরা। এখানেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বিকৃত হয়ে যায় মুনাফার নগ্ন তাণ্ডবে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, কিন্ডারগার্টেনে পড়ালেখা করানোর পরও শিশুদেরকে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা হয়। অভিভাবকদের অসচেতনতা আর শিক্ষকদের অর্থোপার্জনের ব্যাকুলতা শিশুদেরকে করে তোলে কোচিং-নির্ভর। এভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আড়ালে গড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য শিক্ষা শিল্প।
এই ব্যবস্থায় শিক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিক বেতন নামমাত্র-পনেরো শত থেকে দুই হাজার পাঁচ শত টাকা। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো আসলে প্রতারণামাত্র। বাস্তবে এই শিক্ষকরা প্রাইভেট ও কোচিংয়ের মাধ্যমে অর্থোপার্জন করেন, যা তাদেরকে সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। শিশুদের প্রতি এই দায়িত্বহীনতার বিনিময়ে গড়ে উঠছে একটি বিকৃত শিক্ষাসংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠান মালিকদের একচ্ছত্র আধিপত্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই নিয়ন্ত্রিত। শিক্ষকের পদোন্নতি, চাকরির স্থায়িত্ব সবই প্রতিষ্ঠান মালিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার এই বাণিজ্যিকীকরণ শিশুদের শৈশবকে করছে নিষ্পেষিত, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে করছে ধ্বংস। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এই লোভের ব্যবস্থাকে রুখতে হবে। প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা এবং শিশুদের শৈশবকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয় সচেতনতা গড়ে তোলা।














