মেহেদির ছিমছাম নকশায় ঈদ
উৎসবে নিজেকে সাজাতে মেয়েদের জন্য মেহেদি এক অনন্য অনুষঙ্গ। আগেকার দিনে ঈদে হাতভর্তি নকশায় মেহেদি লাগানোর চল থাকলেও এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চলে বদল এসেছে। এখনকার তরুণীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে মেহেদি লাগানোর চেয়ে ছিমছাম বা এককথায় সিম্পল নকশা বেশি পছন্দ করছেন। মেহেদির সৌন্দর্য কেবল তার গাঢ় রঙে নয়, বরং তার পরিচ্ছন্ন নকশায়।

শোভন মেকওভারের স্বত্বাধিকারী কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা বলেন, ‘এবার খুব হালকা নকশার মেহেদি ট্রেন্ডে রয়েছে। হাতের তালুতে একটু ঘন নকশা হলেও হাতের ওপরের পিঠে হালকা নকশাতেই মন ভরছে তরুণীদের।’
■ যেসব নকশা ট্রেন্ডে রয়েছে এবার
» লেসি ফ্লোরাল ডিজাইন
- ফুলের মোটিফের সঙ্গে লেসের মতো সূক্ষ্ম কারুকাজ এই নকশাকে অনন্য করে তোলে। যাঁরা হাতে একটু জালের মতো কাজ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি হবে দারুণ পছন্দ।

» সার্কেল ও ভাইন নকশা
- হাতের তালুর মাঝখানে গোলাকার বৃত্ত বা ম্যান্ডালা এবং তার চারপাশে লতাপাতার নকশা। এই ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনটি একদিকে যেমন সহজ, অন্যদিকে দেখতে চমৎকার।
» লোটাস বা পদ্ম মোটিফ
- মেহেদির নকশায় পদ্ম ফুলের ব্যবহার এখন বেশ ট্রেন্ডি। হাতের তালুর মাঝখানে বা আঙুলের মাথায় ছোট ছোট পদ্মের নকশা হাতকে দেয় এক স্নিগ্ধ লুক।
» ঝরোকা স্টাইল
রাজস্থানি ঘরানার এই নকশায় হাতের ওপর জানালার মতো বা ঝরোকা প্যাটার্ন তৈরি করা হয়। আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতে এই স্টাইলটির জুড়ি নেই।
» ফ্লোরাল মেজ
- এই নকশায় পুরো হাতে জালের মতো করে ছোট ছোট ফুল ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এটি দেখতে যেমন শৈল্পিক, তেমনই আধুনিক।
» মিনিমালিস্ট ব্রাইডাল লুক
- এখন অনেক কনেও খুব ভারী নকশা এড়িয়ে চলেন। ঈদের পর যাঁদের বিয়ে, তাঁদের জন্য এটি সেরা। ছিমছাম কিন্তু বিয়ের সাজের সঙ্গে মানানসই এই নকশাগুলো বিশেষ দিনে আপনাকে দেবে এক মার্জিত রূপ।
» কো-অর্ডিনেটেড ডিজাইন
- দুই হাতের নকশায় যখন একই ধরনের সামঞ্জস্য বজায় রাখা হয়, তাকে কো-অর্ডিনেটেড ডিজাইন বলে। দুই হাত এক করলে যখন একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা ফুটে ওঠে, তখন তা দেখতে দারুণ লাগে।
» লেসি-ব্যাক-হ্যান্ড ডিজাইন
- হাতের উল্টো পিঠে কবজি থেকে আঙুল পর্যন্ত জালের মতো সূক্ষ্ম লেস ডিজাইন এখনকার তরুণীদের কাছে জনপ্রিয়। এটি হাত অনেক বেশি লম্বা ও সরু দেখাতে সাহায্য করে।
» গ্রেসফুল সিম্পল ডিজাইন
- এটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু অভিজাত নকশা। খুব অল্প কিছু লতাপাতা এবং বিন্দুর ব্যবহারে হাতের তালুর একাংশ সাজানো হয়, যা দেখতে অত্যন্ত মার্জিত।
এ তো গেল মেহেদির ট্রেন্ডের কথা। এবার আসা যাক কী করে এই মেহেদির রং পাকা করবেন সে বিষয়ে।
শোভন সাহা জানান, মেহেদি লাগানোর আগের প্রস্তুতিতে মন দিতে হবে। প্রথমে হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে তেল ও ময়লা মুক্ত করে নিন। চিনি ও লেবুর রস দিয়ে হালকা স্ক্রাব করলে মৃত কোষ দূর হয় এবং রং দ্রুত বসে। এ ছাড়া ওয়াক্সিং বা পেডিকিউর-মেনিকিউরের মতো কাজগুলো অন্তত দুই দিন আগে সেরে ফেলুন, নতুবা মেহেদির রং দ্রুত ফিকে হয়ে যায়।
শোভন সাহা জানান, মেহেদির রং গাঢ় করার কিছু উপায় রয়েছে। সেগুলো সবাইকেই মেনে চলতে হবে। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত রং পাওয়া যাবে। সেগুলো হলো,
■ দীর্ঘ সময় রাখা
মেহেদি যত বেশি সময় ত্বকের সংস্পর্শে থাকবে, রং তত গাঢ় হবে। অন্তত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা মেহেদি হাতে রাখুন। সবচেয়ে ভালো ফল পেতে রাতে লাগিয়ে সকালে তুলে ফেলুন।
■ লেবু-চিনির মিশ্রণ
মেহেদি একটু শুকিয়ে এলে তুলা দিয়ে লেবুর রস ও চিনির মিশ্রণ আলতো করে লাগিয়ে নিন। এটি মেহেদিকে ত্বকের সঙ্গে আটকে রাখে এবং রং গাঢ় করে।
■ লবঙ্গের ভাপ
একটি প্যানে কয়েকটি লবঙ্গ গরম করুন। মেহেদি শুকিয়ে আসার পর সেই লবঙ্গের ধোঁয়ায় হাত কিছুক্ষণ ধরুন। লবঙ্গের ভাপ মেহেদির রংকে গাঢ় করতে দারুণ কার্যকর।
■ সরিষার তেল
মেহেদি শুকিয়ে যাওয়ার পর বাকি অংশ পানি দিয়ে না ধুয়ে হাত দিয়ে ঘষে তুলে ফেলুন। এরপর হাতে সরিষার তেল বা ভিক্স জাতীয় বাম ম্যাসাজ করুন। এটি তাপ উৎপন্ন করে রং স্থায়ী ও গাঢ় করে।
■ প্রাকৃতিক তেল
মেহেদি লাগানোর আগে হাতে ইউক্যালিপটাস তেল বা মেহেদি তেল লাগিয়ে নিলে রঙের উজ্জ্বলতা বাড়ে।
■ চা-কফির লিকার
মেহেদি গোলানোর সময় সাধারণ পানির বদলে চায়ের গাঢ় লিকার বা কফি ব্যবহার করতে পারেন। এর ট্যানিন রং আরও গাঢ় করে।
■ বিট
প্রাকৃতিক লালচে আভা পেতে মেহেদিতে সামান্য বিটমূলের রস বা গুঁড়া মেশানো যায়।
■ চিনি মেশানো
মেহেদি মিশ্রণে সামান্য চিনি যোগ করলে তা ত্বকে দীর্ঘক্ষণ আর্দ্রতা ধরে রাখে, যা রং ছড়াতে সাহায্য করে।
■ প্লাস্টিক বা ক্লিং র্যাপ
মেহেদি শুকিয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে হাত পাতলা প্লাস্টিক বা ক্লিং র্যাপ দিয়ে মুড়িয়ে রাখতে পারেন। এতে শরীরের তাপে রং গাঢ় হয়।
■ পানি থেকে দূরে থাকা
মেহেদি তোলার পর অন্তত ১২ ঘণ্টা হাতে পানি বা সাবান লাগাবেন না। পানি লাগালে অক্সিডেশন-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
■ চুন বা লেবুর রস
মেহেদি তোলার পর হাতে সামান্য চুন বা লেবুর রস ঘষলে অনেক সময় রং দ্রুত গাঢ় হয়, তবে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।
■ নারকেল তেল বা ভ্যাসলিন
পানি থেকে সুরক্ষা পেতে হাত থেকে মেহেদি তোলার পর হাতে নারকেল তেল বা ভ্যাসলিন লাগিয়ে নিন। এটি একটি লেয়ার তৈরি করে রং সুরক্ষিত রাখবে।
■ সতর্কতা
মেহেদির রং ও উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে আরও কিছু টিপস—
» হেয়ার ড্রায়ার এড়িয়ে চলুন: মেহেদি শুকাতে ড্রায়ার ব্যবহার করবেন না।
» ব্লিচ ও শেভিং বন্ধ রাখুন: মেহেদি থাকা অবস্থায় ব্লিচ বা শেভিং করবেন না; এটি ত্বকের ওপরের স্তর তুলে রং নষ্ট করে দেয়।
» প্রাকৃতিক মেহেদি বেছে নিন: অ্যালার্জি এড়াতে ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত ‘কালো মেহেদি’ বাদ দিয়ে সব সময় প্রাকৃতিক মেহেদি ব্যবহার করুন।

















