৫৪ বছর পর আবার কেন চাঁদে যাচ্ছে মানুষ
১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর। অ্যাপোলো ১৭-এর কমান্ডার জিন সারনান চাঁদের ধূলিকণায় শেষ পদচিহ্ন এঁকে ফিরে আসছিলেন। তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি, তাঁর ফিরে আসার পরবর্তী পাঁচ দশকের বেশি সময় সেখানে আর কোনো মানুষের পা পড়বে না। অবশেষে এ বছর আর্টেমিস-২ মিশনের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।
কেন এই দীর্ঘ বিরতি
আর্টেমিস-২ এর ক্রুরা। বাম দিক থেকে কোচ, গ্লোভার, হ্যানসেন এবং ওয়াইজম্যান। ছবি: উইকিপিডিয়া
আর্টেমিস-২ এর ক্রুরা। বাম দিক থেকে কোচ, গ্লোভার, হ্যানসেন এবং ওয়াইজম্যান। ছবি: উইকিপিডিয়া
চাঁদে যাওয়ার পথে বড় বাধা শুধু প্রযুক্তি নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও তার বড় বাধা। নাসার সাবেক প্রযুক্তিবিদ লেস জনসন জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৪ বা ৮ বছর পর নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে নাসার লক্ষ্য বদলে যায়। যেমন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করলেও ওবামা এসে তা পরিবর্তন করে গ্রহাণু গবেষণায় মন দেন। ট্রাম্প আবার চাঁদকে প্রাধান্য দেন এবং জো বাইডেন সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। অ্যাপোলো প্রোগ্রামের বিশাল বাজেটের পর সরকারগুলো এমন দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল।
অনেকে প্রশ্ন করেন, ষাটের দশকে যদি চাঁদে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে এখন কেন এত দেরি হচ্ছে? অ্যাপোলোর রকেট এবং যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ও দক্ষ কারিগরেরা এখন আর নেই। সেই পুরোনো প্রযুক্তি আজ নতুন করে তৈরি করাও অবাস্তব। ১৯৬৭ সালের অ্যাপোলো-১ অগ্নিকাণ্ড এবং পরবর্তী মহাকাশযান দুর্ঘটনাগুলো নাসাকে অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে। সে কারণে এখনকার মিশনগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ করার চেষ্টা করা হচ্ছে সর্বাত্মকভাবে।
অ্যাপোলো বনাম আর্টেমিস
লঞ্চ কমপ্লেক্সে আর্টেমিস-২, জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: উইকিপিডিয়া
লঞ্চ কমপ্লেক্সে আর্টেমিস-২, জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: উইকিপিডিয়া
আর্টেমিস-২ এর পথরেখা অ্যাপোলো ৮-এর মতোই। কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে এটি কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে। এটিকে সর্বাধুনিক করে সাজানো হয়েছে। এর নতুন ফিচারগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়।
কম্পিউটার ক্ষমতা: আর্টেমিসের ওরিয়ন ক্যাপসুলের কম্পিউটার অ্যাপোলোর চেয়ে ২০ হাজার গুণ দ্রুত এবং এতে ১ লাখ ২৮ হাজার গুণ বেশি মেমোরি রয়েছে। ফলে আর্টেমিস-২-এর তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা অনেক বেশি।
শৌচাগার ও গোপনীয়তা: অ্যাপোলোর নভোচারীদের বর্জ্য সংগ্রহের জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু ওরিয়নে একটি আধুনিক প্রাইভেট বাথরুম রয়েছে, যা নারী ও পুরুষ নভোচারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
স্থায়ী আবাসন: অ্যাপোলো ছিল শুধু পতাকা আর পদচিহ্ন রেখে আসার মিশন। কিন্তু আর্টেমিসের লক্ষ্য হলো চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি বা লুনার বেস তৈরি করা।
নতুন প্রতিযোগিতা
ষাটের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারানোর লক্ষ্য ছিল আমেরিকার। বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন তাদের প্রতিযোগিতা চীনের সঙ্গে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। আমেরিকা তার বন্ধুদেশগুলোকে নিয়ে আর্টেমিস অ্যাকর্ডস গঠন করেছে, যাতে তারা মহাকাশে শান্তি ও বাণিজ্যিক খননের অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
মহাকাশবিজ্ঞানী জন ইয়ং ২০০৪ সালে বলেছিলেন, ‘এক গ্রহের প্রজাতি হিসেবে মানুষ বেশি দিন টিকবে না।’ সেই লক্ষ্যেই আর্টেমিস মিশন শুধু চাঁদে ফেরা নয়, এটি মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পথে প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র: সিএনএন, রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রেনউইচ














