মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়ার পথে বিজ্ঞান
মানুষের সবচেয়ে আদিম ভয় হলো বার্ধক্য এবং মৃত্যু সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ অমৃতের সন্ধান করেছে যা তাকে চিরযৌবন দান করবে রূপকথার গল্পে আমরা সুধা বা অমৃতের কথা শুনেছি কিন্তু বাস্তবে তা ছিল অধরা তবে আজ সেই রূপকথা বাস্তবে ধরা দিল ভারতের মাটিতে হায়দ্রাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বা সিসিএমবি এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি বা এনআইআই এর বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এমন এক রাসায়নিক যৌগ আবিষ্কার করেছেন যা মানুষের শরীরের বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে কেবল থামিয়ে দেয় না বরং তাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম আজ সকালে হায়দ্রাবাদে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলনে এই ওষুধের ঘোষণা করা হয় যার নাম দেওয়া হয়েছে নবযৌবন বা নিউ ইয়ুথ
দীর্ঘ কুড়ি বছরের গবেষণার ফসল
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ এবং কঠিন যাত্রাপথ সিসিএমবি এর প্রধান বিজ্ঞানী ডক্টর রাঘবেন্দ্র রাও এবং তার দল গত দুই দশক ধরে মানবদেহের ডিএনএ এবং ক্রোমোজোম নিয়ে গবেষণা করছিলেন তারা লক্ষ্য করেন যে আমাদের ক্রোমোজোমের প্রান্তে টেলোমেয়ার নামে একটি অংশ থাকে যা বয়সের সাথে সাথে ছোট হতে থাকে এই টেলোমেয়ার ছোট হয়ে যাওয়া মানেই কোষে বার্ধক্য আসা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটা বিজ্ঞানীরা এমন একটি এনজাইম বা উৎসেচক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যা এই টেলোমেয়ারকে পুনরায় লম্বা করতে পারে এবং কোষকে নতুন জীবন দিতে পারে
নবযৌবন ক্যাপসুল কীভাবে কাজ করে
নবযৌবন কোনো সাধারণ ভিটামিন বা শক্তি বর্ধক ওষুধ নয় এটি সরাসরি আমাদের জিনের ওপর কাজ করে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন এই ক্যাপসুলটি খাওয়ার পর তা রক্তে মিশে শরীরের প্রতিটি কোষে পৌঁছে যায় সেখানে এটি দুটি কাজ করে প্রথমত এটি টেলোমেয়ারের দৈর্ঘ্য বাড়ায় এবং দ্বিতীয়ত এটি শরীরের জম্বি সেল বা মৃতপ্রায় কোষগুলোকে ধ্বংস করে জম্বি সেল হলো সেই কোষগুলো যা বিভাজিত হতে পারে না কিন্তু শরীরে থেকে গিয়ে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি করে এবং বার্ধক্যের ছাপ ফেলে এই ওষুধটি সেই আবর্জনা পরিষ্কার করে শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ করে তোলে
হিউম্যান ট্রায়াল বা মানুষের ওপর পরীক্ষার ফলাফল
গত তিন বছর ধরে প্রায় ১০০০ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এই ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়েছে যাদের বয়স ছিল ৬০ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে ফলাফল ছিল বিস্ময়কর ৮০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ যিনি লাঠি ছাড়া হাঁটতে পারতেন না এই ওষুধ খাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তিনি জগিং করতে শুরু করেছেন তার চামড়ার ভাজ বা রিঙ্কেলস মিলিয়ে গেছে এবং সাদা চুল কালো হতে শুরু করেছে রক্তচাপ এবং সুগারের সমস্যা যা বার্ধক্যের সাথে আসে তা প্রায় উধাও হয়ে গেছে স্বেচ্ছাসেবীরা জানিয়েছেন তারা শারীরিক এবং মানসিকভাবে ৩০ বছর পিছিয়ে গেছেন বলে অনুভব করছেন
চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিপ্লব
ডক্টর রাও বলেন আমরা মৃত্যুকে জয় করতে পারিনি কিন্তু আমরা বার্ধক্যকে জয় করেছি একজন মানুষ এখন ১০০ বছর বা তার বেশি সময় সুস্থ সবলভাবে বাঁচতে পারবেন আগে শেষ জীবনে মানুষকে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাটাতে হতো এখন তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কর্মক্ষম থাকবেন অ্যালঝাইমার্স বা স্মৃতিভ্রংশ এবং পারকিনসন্স এর মতো রোগ যা বার্ধক্যের কারণে হয় তা এই ওষুধের ফলে চিরতরে নির্মূল হবে বলে আশা করা হচ্ছে
সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব
এই আবিষ্কারের ফলে সমাজের কাঠামোতে এক বিশাল পরিবর্তন আসবে বর্তমানে অবসরের বয়স ৬০ বা ৬৫ বছর কিন্তু মানুষ যদি ৮০ বা ৯০ বছর পর্যন্ত যুবক থাকে তবে অবসরের বয়স বাড়াতে হবে এর ফলে পেনশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং দেশের অর্থনীতিতে অভিজ্ঞ মানুষের অবদান বাড়বে অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে কারণ বয়স্করা যদি অবসর না নেন তবে তরুণরা চাকরি পাবে কোথায় সমাজবিজ্ঞানীরা এখন থেকেই এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য নীতি তৈরির কথা বলছেন
নৈতিকতা এবং অমৃতের অধিকার
প্রতিটি বড় আবিষ্কারের সাথে কিছু নৈতিক প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে নবযৌবন ওষুধের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে প্রশ্ন উঠছে এই ওষুধ কি কেবল ধনীরা কিনতে পারবে নাকি গরিবরাও এর সুবিধা পাবে যদি কেবল ধনীরা চিরযৌবন লাভ করে তবে সমাজে এক নতুন বৈষম্য তৈরি হবে সরকার অবশ্য জানিয়েছে তারা এই ওষুধটিকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় রাখবে এবং জন ঔষধি কেন্দ্রের মাধ্যমে সস্তায় বিক্রি করবে যাতে রিক্সাচালক থেকে শুরু করে শিল্পপতি সবাই এর সুবিধা নিতে পারেন

















