রতি থেকে জ্যোতি☞পর্ব: ২ (দ্বিতীয় ধাপ)
দেহতত্ত্বের নিগূঢ় আলোচনা এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের আলোকে মাং(মায়াবী), মাম(মায়া), কাম, প্রেম এবং নূর- এই পাঁচটি স্তম্ভের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে আলাদা আলাদা শিরোনামে আপনাদের সম্মুখে উপস্থাপন করার চেষ্টা করিলাম:>>
**১. মাং(মায়াবী):> নারীর আভ্যন্তরীণ আধ্যাত্মিক শক্তি বা মায়ারস:- “মাং(মায়াবী)” শব্দটি প্রচলিত কোনো শব্দ নয়, বরং এটি দেহতত্ত্বের একটি বিশেষ সাংকেতিক প্রতীক। এটি মূলত নারীর দেহের সেই বিশেষ “মায়ারস” বা “মা-তাত্ত্বিক” শক্তিকে নির্দেশ করে যা সাধনার প্রাথমিক উপাদান। এই শক্তিটিই সাধকের কাম-ভাবনাকে পরিশুদ্ধ করে প্রেমে রূপান্তরিত করার শক্তি জোগায়। চিত্রে এটি নারীর অনন্য শক্তিকে চিহ্নিত করে, যা পুরুষের “রতি” শক্তির সাথে মিলিত হয়ে ঊর্ধ্বমুখী এক জ্যোতি বা নূরের সৃষ্টি করে। সহজ কথায়, “মাং(মায়াবী)” হলো সেই আধ্যাত্মিক রস যা সাধনার পথে নারীকে কেবল ভোগের আধার নয়, বরং শক্তির আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
**২. মাম বা মায়া:> সৃষ্টির মমতা ও শক্তির ভারসাম্য:- “মাম বা মায়া” শব্দটি আধ্যাত্মিক সাধনায় একটি গভীর রূপক। এটি মূলত “মায়ারস” বা “মায়াবী মায়া” এর সংক্ষিপ্ত রূপ। নারী যেহেতু সৃষ্টির জননী রূপের আধার, তাই তার ভেতরের পরম মমত্ব ও আধ্যাত্মিক রসকে এই সংকেত দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। এটি একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, পুরুষের জৈবিক “কাম” যখন নারীর এই “মমত্ব” বা “মায়া” রসের সংস্পর্শে আসে, তখন তা লালসা মুক্ত হয়ে শুদ্ধ হতে শুরু করে। “মাম” বা মায়া হলো সেই শক্তি যা কামের বিষকে অমৃতের দিকে ধাবিত করে এবং সাধককে জ্যোতির পথে এগিয়ে নেয়।
**৩. কাম:> রূপান্তরের কাঁচামাল ও সাধনার প্রথম ধাপ:- দেহতত্ত্বে “কাম” কেবল শারীরিক আকর্ষণ নয়, বরং এটি একটি সুপ্ত এবং শক্তিশালী জীবনী শক্তি। সাধকদের মতে, কাম বর্জনীয় নয়, বরং শোধনযোগ্য। এটি একটি আগুনের মতো, যা কাঁচা সোনাকে পুঁড়িয়ে খাঁটি করে। যখন পুরুষের কাম-ভাবনা নারী-ভাবনায় জারিত হয় এবং সাধক তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টিকর্তা/ঈশ্বরের কুদরতের দর্পণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তখনই কাম তার ধ্বংসাত্মক রূপ (কালনাগিনী) হারিয়ে দিব্যভাবনায় পরিণত হয়। কাম হলো সেই কাঁচামাল বা বীজ, যা সঠিক সাধনার মাটিতে রোপণ করলে নূরের বৃক্ষ জন্ম নেয়।
**৪. প্রেম:> রতিকে জ্যোতিতে রূপান্তরের অনুঘটক:- প্রেম কোনো সাধারণ আবেগ নয়, এটি একটি “কিমিয়া” বা পরশপাথর। যখন কাম নিজেকে পুঁড়িয়ে ভস্ম করে, তখন তার ছাঁই থেকে প্রেমের জন্ম হয়। সাধকের কাছে প্রেম হলো রতিকে অপচয় না করে দেহের ঊর্ধ্বে- হৃদয়ে (কলবে) বা মস্তিষ্কের জ্যোতি দেশে টেনে তোলার প্রধান চালিকাশক্তি। প্রেমহীন মিলন দেহরসকে বিষাক্ত করে জীবনী শক্তি হ্রাস করে, পক্ষান্তরে প্রেমময় মিলন দেহরসকে ওজঃ শক্তিতে পরিণত করে। এটি-ই সেই আধ্যাত্মিক মইথনের চাবিকাঠি যা রতিকে মতিতে এবং মতিকে জ্যোতিতে রূপান্তরিত করে সাধককে অমরত্বের স্বাদ দেয়।
**৫. নূর:> পরম সত্যের আলো ও সাধনার চূড়ান্ত প্রাপ্তি:- “নূর” হলো আধ্যাত্মিক সাধনার সর্বোচ্চ স্তর বা জ্যোতির দেশ। রতি যখন প্রেমের প্রভাবে মতির সাথে মিলিত হয়ে মেরুদণ্ডের পথ ধরে মস্তিষ্কের “সুলতানুল আজকারে” পৌঁছায়, তখন সাধকের ভেতরে এক মহাজাগতিক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। এই স্তরে পৌঁছালে সাধকের নিজস্ব কোনো আমিত্ব থাকে না, তার ইচ্ছা স্রষ্টার ইচ্ছায় বিলীন হয়ে যায়। এই নূর বা জ্যোতি-ই হলো অন্ধকার (কামনা-বাসনা) থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্যের সাথে একীভূত হওয়া। যখন পুরুষের সংরক্ষিত রতি এবং নারীর রূপান্তরিত প্রেমরস একীভূত হয়, তখন-ই সেখানে “নূরুন আলা নূর” বা ঐশী জ্যোতির উদয় ঘটে- আমিন >চলমান পাতা।

















