দুনিয়া একটি মুসাফিরখানা
এই দুনিয়াটা একটা মুসাফিরখানা আর আমরা সবাই সেই পথের যাত্রী। গন্তব্য জানা নেই কারো, তবুও আমরা ছুটে চলি সময়ের এই বাহনে। সুফিবাদ আমাদের শেখায়—বাহিরের এই সফরের চেয়ে অন্তরের সফরটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যেন কেবল পথের পথিক না হয়ে, পরম সত্তার সন্ধানী হতে পারি।
পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমরা সবাই একই গন্তব্যের যাত্রী। কারো সাথে পথ চলা ক্ষণিকের, কারো সাথে দীর্ঘদিনের—তবুও এই ভ্রাতৃত্বই জীবনের সৌন্দর্য। স্রষ্টার সৃষ্টিতে সবাই সমান, সবাই সবার আপন।
১. দুনিয়া একটি মুসাফিরখানা
সুফি দর্শনে এই পৃথিবী হলো একটি স্বল্পস্থায়ী সফর। ছবিতে সবাই বাসে বসে আছেন, কিন্তু কারো গন্তব্যই এই বাসটি নয়। সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায়।
শিক্ষা: আমরা সবাই এই পৃথিবীতে ‘মুসাফির’ বা যাত্রী। বাসটি যেমন সময়ের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের জীবনও মৃত্যুর দিকে এবং পরমাত্মার (আল্লাহর) মিলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
২. সহযাত্রী ও মানবপ্রেম।
বাসে বিভিন্ন স্তরের মানুষ একসাথে বসে আছেন—কেউ হয়তো বিত্তশালী, কেউ সাধারণ। কিন্তু সবার পথ এক।
শিক্ষা: সুফিবাদ আমাদের শেখায় যে মানুষের বাহ্যিক পোশাক বা অবস্থান বড় কথা নয়। অন্তরের বন্ধনই আসল। এই বাসের যাত্রীদের মতো আমরা সবাই একে অপরের ভাই-বোন, যারা একই রবের সৃষ্টি। সবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান রাখাটাই আধ্যাত্মিকতার মূল।
৩. স্থিরতা ও সমর্পণ (তাওয়াক্কুল)
যাত্রীরা বাসে বসে আছেন শান্তভাবে। তারা জানেন না সামনে রাস্তা কেমন হবে বা কোনো বিপত্তি ঘটবে কি না, কিন্তু তারা চালকের ওপর ভরসা করে বসে আছেন।
শিক্ষা: আধ্যাত্মিক জীবনে একে বলা হয় ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। জীবনের বাসটি মহান আল্লাহ চালাচ্ছেন—এই বিশ্বাসে শান্ত থাকাই একজন প্রকৃত সুফির বৈশিষ্ট্য।
সফর দস্ত ওয়াতন” (দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ) — এটি একটি সুফি পরিভাষা, যার অর্থ হলো বাইরে ভ্রমণ করার সাথে সাথে নিজের অন্তরের গভীরে ভ্রমণ করা। এই বাসের সফরটি আপনার জন্য কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম না হয়ে নিজের আত্মাকে চেনার উপলক্ষও হতে পারে।
এই পৃথিবীটা একটা চলন্ত বাস, আর আমরা সবাই স্বল্পসময়ের যাত্রী। আমাদের গন্তব্য এক, কিন্তু পথ একেকজনের একেকরকম। কারো সাথে দেখা হয় ক্ষণিকের জন্য, আর কেউ থেকে যায় স্মৃতির পাতায়। আসল গন্তব্য তো এই মাটির দেহ ছাড়িয়ে সেই পরমাত্মার সাথে মিলন।
সফর যখন নিজের ভেতরের দিকে হয়, তখন চারপাশের ভিড়ের মাঝেও একাকীত্বের এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। বাসের জানালার বাইরে যেমন দৃশ্য পাল্টায়, আমাদের জীবনটাও ঠিক তেমনই—পরিবর্তনশীল। স্থির শুধু আমাদের ভেতরের সেই ‘আমি’ ।
আমরা তো কেবল সওয়ারি, জীবনের গাড়িটি চালাচ্ছেন অন্য কেউ। বিশ্বাস আর ভরসা থাকলে এই বন্ধুর পথটিও সহজ হয়ে যায়। যেখানেই যাই না কেন, শেষমেশ আমরা সবাই তাঁরই দিকে ফিরে যাচ্ছি।”

















