প্রথম আজানের মহিমা
🕌 মক্কার তপ্ত মরুর বালুচর। মধ্যগগনের সূর্য যেন আগুন ঝরাচ্ছে। সেই উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে হাবশী গোলাম বিলালকে। তাঁর বুকের ওপর বিশাল এক পাথর চাপা দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি নিশ্বাসও নিতে না পারেন। মালিক উমাইয়া ইবনে খালাফ চিৎকার করে বলছে, “মোহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর, নয়তো এভাবেই মরবি!”
কিন্তু বিলালের ফাটা ঠোঁট দিয়ে অস্ফুট স্বরে বের হয়ে আসছিল এক অবিনাশী সত্য:
“আহাদ! আহাদ!” (আল্লাহ এক! আল্লাহ এক!)
অমানুষিক এই নির্যাতন দেখে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁকে কিনে মুক্ত করে দিলেন। বিলাল পেলেন নতুন জীবন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চিরস্থায়ী সান্নিধ্য।
প্রথম মুয়াজ্জিন ও মদীনার আকাশ
হিজরতের পর মদীনায় যখন নামাজের জন্য ডাকার প্রয়োজন হলো, তখন নবীজি (সাঃ) তাঁর সেই সুমধুর কণ্ঠের প্রিয় সাহাবী বিলালকেই দায়িত্ব দিলেন। মদীনার আকাশে প্রথমবার ধ্বনিত হলো: “আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!” বিলালের সেই উদাত্ত আহ্বান শুনে মদীনাবাসীরা কাজ ফেলে মসজিদের দিকে ছুটে আসতেন। তাঁর কণ্ঠে এমন এক যাদু ছিল যে, মানুষ আজানের শব্দে বিমোহিত হয়ে পড়ত। নবীজি (সাঃ) বলতেন, “বিলাল যখন আজান দেয়, তখন আসমানেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।”
কাবার ছাদে বিজয়ধ্বনি
৮ হিজরী। মক্কা বিজিত হয়েছে। যে মক্কায় বিলাল নির্যাতিত হয়েছিলেন, আজ সেখানেই তিনি বীরের বেশে প্রবেশ করলেন। নবীজি (সাঃ)-এর নির্দেশে তিনি কাবাঘরের ছাদে উঠে দাঁড়ালেন। মূর্তিপূজার অন্ধকারে আচ্ছন্ন সেই শহরে প্রথমবারের মতো ধ্বনিত হলো তাওহীদের গান। কুরাইশরা অবাক হয়ে দেখল—একসময়ের ‘ক্রীতদাস’ আজ ইসলামের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে আসীন।
নবীপ্রেম ও নীরব হয়ে যাওয়া কণ্ঠ
নবী করীম (সাঃ)-এর ইন্তেকালের পর বিলালের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। মদীনার অলিগলি দেখে তাঁর কেবল নবীজির স্মৃতি মনে পড়ত। আজান দিতে দাঁড়িয়ে যখন তিনি বলতেন— “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল), তখন তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসত, চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকত। তিনি আর আজান শেষ করতে পারতেন না।
শোকে কাতর বিলাল মদীনা ছেড়ে সিরিয়ায় চলে গেলেন। বছরের পর বছর কেটে গেল। খলিফা উমর (রাঃ) যখন সিরিয়া সফরে গেলেন, সাহাবীরা অনুরোধ করলেন বিলালকে একবার আজান দিতে দেখার জন্য। অনেক অনুরোধের পর বিলাল (রাঃ) মিনারায় দাঁড়িয়ে আজান দিলেন।
সেই কণ্ঠ শুনে সাহাবীদের মনে হলো তাঁরা যেন আবার নবীজির যুগে ফিরে গেছেন। কান্নার রোলে সিরিয়ার আকাশ ভারী হয়ে উঠল। নবীজির বিরহে বিলালের সেই কান্না মদীনার প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল।
শিক্ষা:
১. সমতা: ইসলামে সাদা-কালো বা মালিক-ক্রীতদাসের কোনো ভেদাভেদ নেই; ঈমানই হলো শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।
২. ধৈর্য: সত্যের পথে অটল থাকলে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
৩. ইশকে রাসূল (সাঃ): নবীজির প্রতি বিলালের যে অগাধ প্রেম ছিল, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

















