ইমামের প্রাপ্তি কি কেবলই বেতন নাকি আমাদের বিবেকের দায়বদ্ধতা?
সাবধান, ইমাম যেন বেশি টাকা না পায়
ঘটনা ১: ঈদের জামাত শেষে কমিটির এক প্রতিনিধি দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, রুমাল কোনটা আগে চলবে? হুজুরেরটা নাকি মসজিদেরটা। তার ধারণা ছিল, লোকেরা বলবে, মসজিদেরটা। আর মসজিদের রুমালটা আগে চালালে তাতে টাকা বেশি হবে। দরকার তো মসজিদের। ইমামেরটাতে বেশি হবে কেন? কিন্তু মুসল্লিরা বললেন, ‘ইমাম সাহেবেরটা’। ইমামের রুমালে টাকা আসল ১২ হাজার আর মসজিদের রুমালে ১০ হাজার। কমিটির মন খারাপ। মসজিদের রুমালটা আগে চালাতে পারলে ২ হাজার টাকা বাড়ত। অথচ কমিটির কেউ দাঁড়িয়ে মানুষকে উৎসাহিত করেননি। বলেনি, আজ হাতখুলে দুটোতেই দান করব। ইমাম সাহেব শুধু মসজিদে দানের ফজিলত বললেন, নিজেকে দেবার কথা একটুও বললেন না।
বাংলাদেশের অনেক মসজিদেরই কমিটির মন এখনো অনেক সংকীর্ণ৷ সারাবছর যে ইমাম মসজিদের তহবিল বাড়াতে মনপ্রাণ উজাড় করে চেষ্টা করেন, তার জন্য ঈদের দিনেও একটু ছাড় দিতে পারে না৷ ঈদের দিনেও মসজিদের রুমাল চালাতেই হবে!
আচ্ছা, চালানো হোক, কিন্তু ইমাম সাহেবের রুমালটা আগে চললে মসজিদের টাকা কমে যাবে এ সংকীর্ণ চিন্তা কেন আসবে? তা আগেই চলুক মসজিদেরটা। একজন তো একটু দরদ নিয়ে দাঁড়িয়ে ইমামের অবদান, আন্তরিকতা ও তার প্রতি কর্তব্য বলতে পারেন। তা না করে ইমামের টাকা একটু বাড়লে কমিটির মন খারাপ হয়ে যায়। তাদের ধারণা, ইমাম সাহেবের এতটাকা লাগবে কেন? তাকে বেতন দিয়েছি ৮ হাজার, বোনাস ৪ হাজার, তারাবিহর ৫ হাজার। মোট ১৭ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। আর কেন লাগবে? অন্যদিকে কমিটির শীর্ষ ব্যক্তিদের অনেকের চা-পানের খরচই ৮-১০ হাজার ইমামের বাসাভাড়া ৫ হাজার, স্ত্রী-সন্তান বাবামা সবাই তার হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ এই ইমাম সবসময় মসজিদের টাকা বাড়াতে চেষ্টা করেন। ঈদের দিনে তাকে একটু বেশি হাদিয়া দিতে বললে মুসল্লিরা খারাপ চোখে দেখবে না। বরং ওই মসজিদের প্রতি মুসল্লিদের আন্তরিকতা বাড়বে।
ইমামের জন্য এভাবে টাকা তোলা অনেকের অপছন্দ। আমি এটাকেও সংস্কৃতির অংশ মনে করি৷ বাংলাদেশের ইমামদের এখনো বেশিরভাগই আর্থিক টানাপড়েনে থাকেন। তাদের ব্যাপারে সংকীর্ণতা নয়, উদারতা কাম্য।
ঘটনা ২: ইমাম সাহেবের আর্থিক অনটন নেই। এরপরও কমিটির সভাপতি এলেন ঈদের রাতে। বেতন, বোনাস, তারাবিহ সবমিলিয়ে ইমাম সাহেব যথেষ্ট সম্মানজনক হাদিয়া পেয়েছেন জেনেও ব্যক্তিগতভাবে ইমামকে একটি সম্মানজনক হাদিয়া দিলেন। ঈদ জামায়াতের পর সভাপতি দাঁড়ালেন। বললেন, ‘হুজুর সারাটি বছর আমাদের জন্য, মসজিদের আন্তরিকভাবে কাজ করেন। মসজিদের প্রতিটি কংক্রিট আর ইটবালুতে আমাদের যেমন অবদান, তাঁরও অনেক অবদান। আমাদের সবার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার মমতার হাত থাকে। তার অবদানের বিনিময় টাকা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি চাইবেনও না, কিন্তু আমাদের তো উচিৎ তাকে সম্মানজনক সম্মানি দেওয়া…। প্রিয় ভাইয়েরা, আমরা তো ঈদ করছি আমাদের পরিবারের সাথে। আর আমাদের হুজুর পরিবারকে ছেড়ে, বাবামা সন্তানদের ছেড়ে আমাদের সঙ্গে ঈদ করছেন।
সারাবছরই তো মসজিদের জন্য তিনি কালেকশন করেন; আজকের দিনে প্রাণখুলে আমরা হাদিয়া দেব। নিজে ঈদ সম্মানি কালেকশনের রুমালে ১ হাজার টাকা দিলেন আর বললেন, সবাই আমরা একটু বেশি দেবা৷ চেষ্টা করব উভয় রুমালে ১০০+১০০ টাকা দিতে। আমি আপনাদের সবার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করি। ঈদ মুবারক।’
২-৩ হাজার মুসল্লির জামাতে ইমাম সাহেবের রুমালে টাকা উঠল ৮৮ হাজার আর ইমামের রুমালের পরই মসজিদে দানের রুমাল ছিল তাতে টাকা আসল ৮০ হাজার। অন্য বছর দুটোতেই ২০-৩০ হাজার আসতো। এবার উভয় ফান্ডে টাকা প্রায় ৩ গুণ বাড়ল। টাকাটা কিন্তু সভাপতি একা দেননি, সবাই দিয়েছে। শুধু তার একটু আন্তরিকতার কারণে উভয়ই লাভবান হলো। ওই মসজিদ ঈদ জামাতের টাকার ৩ ভাগের দুইভাগ ইমাম পান। তিনি পেলেন ৫৮ হাজার। মুআজ্জিন পেলেন ২০ হাজার আর মসজিদের খাদেম ১০ হাজার। মসজিদের তহবিলেও যুক্ত হলো ৮০ হাজার।
বাস্তবতা: আন্তরিকতা থাকলে টাকার অভাব হয় না। সংকীর্ণতা দেখালে সবকিছু সংকোচিত হয়ে যায়।














