দায় কার, সমাধান কোথায়?
অপসাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য ও পেশাদারিত্বের সংকট
মফস্বল সাংবাদিকদের বেতন-বঞ্চনা, নৈতিক অবক্ষয় ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত পেশার মর্যাদা—উত্তরণে প্রয়োজন কার্যকর নীতি, জবাবদিহিতা ও আত্মসমালোচনা
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পেশাগত দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা মূলধারার সাংবাদিকতা; অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা এবং ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। এই দ্বৈত বাস্তবতা সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানী-কেন্দ্রিক মিডিয়া কাঠামোর বাইরে থাকা জেলার সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। বিভিন্ন মহলের দাবি, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মফস্বল সাংবাদিক নিয়মিত কোনো পারিশ্রমিক পান না। ফলে জীবিকার তাগিদে তারা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হন—যার কিছু অংশ পেশার নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বেতনহীনতা ও অপসাংবাদিকতার যোগসূত্র
মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে, বেতনহীনতা সরাসরি অপসাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান কারণ। যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিনিধিদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন বা সম্মানী প্রদান করে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মরত অনেক সাংবাদিক আর্থিক সংকটে পড়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি, সুবিধাবাদী সংবাদ পরিবেশন কিংবা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় পক্ষপাতমূলক রিপোর্টিং—এসব প্রবণতা মূলত আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকেই জন্ম নেয়। যদিও সব মফস্বল সাংবাদিককে একই মানদণ্ডে বিচার করা অন্যায়, তবুও বাস্তবতা হলো—একটি অংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো পেশাটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
নৈতিক অবক্ষয় ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
সাংবাদিকতার মৌলিক ভিত্তি হলো সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই মূল্যবোধগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সংবাদ পরিবেশনে বিকৃতি দেখা যাচ্ছে।
একইসঙ্গে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতাও পেশাটিকে দুর্বল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বিরোধ—এসব ঘটনা জনমনে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
দায় কার?
এই সংকটের দায় এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর চাপানো যায় না।
মিডিয়া মালিকপক্ষ: পর্যাপ্ত বেতন ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া
সাংবাদিক সমাজ: নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থতার কিছু উদাহরণ
নিয়ন্ত্রক সংস্থা: কার্যকর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে দুর্বলতা
সমাজ ও পাঠক: অনেক সময় যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভ্রান্তিকর তথ্য গ্রহণ
সব মিলিয়ে এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে।
উত্তরণের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি—
১. ন্যায্য বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
মফস্বলসহ সব পর্যায়ের সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
২. কঠোর নীতিমালা ও নজরদারি
অপসাংবাদিকতা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং নজরদারি জোরদার করতে হবে।
৩. প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
নতুন ও কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা বিষয়ক কর্মশালা এবং আধুনিক সাংবাদিকতা বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
৪. আত্মসমালোচনা ও পেশাগত শুদ্ধতা
সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যেই আত্মসমালোচনার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। পেশার মর্যাদা রক্ষায় ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা অপরিহার্য।
৫. সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা
সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে সদস্যদের অধিকার ও পেশাগত মান রক্ষা পায়।
উপসংহার
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। তাই এই পেশার সংকট মানে সমাজেরই সংকট। অপসাংবাদিকতার দৌরাত্ম্য ও পেশাদারিত্বের অবক্ষয় রোধে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
ন্যায্য পারিশ্রমিক, কঠোর নীতি প্রয়োগ, নৈতিকতার চর্চা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব সাংবাদিকতার হারানো














