জাহারুল ইসলাম জীবন এর আধ্যাত্মিক সংশ্লেষণাত্বক বিশ্লেষণ
রতি থেকে জ্যোতি☞পর্ব:-৭ (শেষ পর্ব)
জৈবিক রসের উর্ধ্বগমন, লতিফা বিন্যাস এবং মানবেদেহে ঐশী জ্যোতি (নূর) প্রকটনের পদ্ধতি।
আমার দীর্ঘ আলোচনার নির্যাস, দেহতত্ত্বের নিগূঢ় রহস্য এবং সুফি দর্শনের আধ্যাত্মিক রসায়নকে একীভূত করে একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্র নিচে উপস্থাপন করছি। এটি আমাদের এই জ্ঞান-সফরের যাত্রায় একটি দালিলিক রূপ।
**১.ভূমিকায়নে প্রক্ষাপট্ :- সৃষ্টির দ্বৈততা ও একত্বের আদি উৎস>> সৃষ্টিতত্ত্বের মূলে রয়েছে এক পরম সত্তার সন্ধানে নিজেকে চেনার বাসনা। সুফি দর্শনের ‘কুন ফায়াকুন’-এর রহস্যে আদম ও হাওয়ার সৃষ্টি মূলত এক অখণ্ড নূরের দুটি মেরু। এই গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য হলো-মানবসত্তা কেবল রক্ত-মাংসের পিণ্ড নয়, বরং এটি একটি ‘ক্ষুদ্র মহাবিশ্ব’ (Microcosm), যেখানে কামের আগুনকে প্রেমের পরশে জ্যোতির নূরে রূপান্তর করা সম্ভব।
**২. রতি-তত্ত্ব: স্থূল হতে সূক্ষ্মে উত্তরণ >> দেহতত্ত্বের ভাষায় মানুষের জৈবিক শক্তি বা ‘রতি’ হলো আধ্যাত্মিক যাত্রার জ্বালানি। এই রতি যখন নিম্নগামী হয়, তখন তা কেবল প্রজনন ও ভোগের কারণ (কাম)। কিন্তু যখন তা সংরক্ষিত ও সাধিত হয়, তখন তা ‘মহা-রতি’ বা ওজঃ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
* পঞ্চরসের মিলন:- দেহতত্ত্ব অনুযায়ী দেহস্থ পাঁচটি উপাদানের সুষম বিন্যাস-ই হলো রতির বিশুদ্ধতা।
* রসায়ন (Alchemy) তত্ত্ব:-যেমন পারদকে শোধন করলে তা স্বর্ণে পরিণত হয়, তেমনি বীর্য বা রতিকে ‘হাবসে দম’ (শ্বাস নিয়ন্ত্রণ) ও জিকিরের মাধ্যমে শোধন করলে তা নূরে রূপান্তরিত হয়।
**৩. লতিফা সমূহ ও আধ্যাত্মিক মানচিত্র:- মানবদেহে অবস্থিত সাতটি সূক্ষ্ম শক্তি কেন্দ্র বা লতিফা হলো নূরের একেকটি স্টেশন। এই গবেষণায় লতিফাকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে:
* নফসের স্তর (নাভিদেশ):- এখানে কামের দহন ঘটে। একে ‘নফসে মুতমাইন্নাহ্’ বা প্রশান্ত আত্মায় রূপান্তর করাই প্রথম ধাপ।
* কলব ও রুহের স্তর (হৃদয় ও বক্ষ):- এখানে রতি প্রেমে রূপান্তরিত হয়। এটি ‘মহামায়া’ বা প্রকৃতির প্রভাবকে দৈব প্রেমে বিলীন করার স্থান।
* আখফা ও সুলতানুল আজকার (মস্তিষ্ক ও ব্রহ্মতালু):- এটিই ‘জ্যোতির দেশ’। এখানে পৌঁছালে রতি এবং মতির (প্রজ্ঞা) মিলন ঘটে, যা সাধককে ‘ফানা’ হতে ‘বাকা’র স্তরে নিয়ে যায়।
**৪. মহামায়া ও সিদ্দিকা: নারীর আধ্যাত্মিক ভূমিকা >> সুফি ও দেহতত্ত্বে নারী কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং সে ‘নূরের আয়না’। নারী তার অন্তরের মায়ারস দিয়ে পুরুষকে আকর্ষণ করে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত সাধনায় সেই নারী-ই হয়ে ওঠে ‘সিদ্দিকা’ বা সত্যের প্রতীক।
* “নারী ও পুরুষের আধ্যাত্মিক মিলন (এজতেমা) হলো দুই নূরের সমাপতন, যার ফলে নশ্বর দেহ অমরত্বের গহ্বরে প্রবেশ করে।”
**৫. মরণ জিতা ও ফানা-ফিলাহ্:- সাধক যখন জীবিত থাকাবস্থায় নিজের নফস বা আমিত্বকে বিসর্জন দেন, তখন তিনি হন ‘মরণ জিতা’। হাদিসে কুদসির মর্মানুযায়ী, তখন তার হাত হয় স্রষ্টার হাত, তার চোখ হয় স্রষ্টার চোখ। এই অবস্থায় সাধকের প্রতিটি নিঃশ্বাস হয় নূরের জিকির।
**৬.বাকা-বিল্লাহ্:- আধ্যাত্মিক সাধনায় বাকা বিল্লাহ্ সেই পরম স্তর, যেখানে সাধক নিজের নশ্বর সত্তাকে আল্লাহর নূরে বিলীন (ফানা) করার পর পুনরায় এক নবতর ও চিরস্থায়ী অস্তিত্ব নিয়ে আল্লাহর মাঝেই বেঁচে থাকেন। এই স্তরে সাধকের নিজস্ব কোনো কামনা থাকে না, বরং তার প্রতিটি কাজ, কথা এবং চিন্তা হয়ে ওঠে মহান স্রষ্টার ইচ্ছার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে সাধক সৃষ্টির মাঝে থেকেও স্রষ্টার সাথে অবিচ্ছিন্ন সংযোগ রক্ষা করেন এবং জগৎহতের কল্যাণে নিজেকে বিলীন করে দেন।
>> সর্বপরি সারমর্ম (The Ultimate Essence):- দেহতত্ত্বের এই নিগূঢ় পথ হলো কামের অনলকে প্রেমের সলিলে ধৌত করে নূরের প্রদীপ জ্বালানো। রতি যখন মতির ঘরে আশ্রয় নেয়, তখন সাধক আর সৃষ্টির গোলকধাঁধায় আটকে থাকেন না, তিনি নিজেই এক একটি চলমান নূর বা আলোক বর্তিকায় পরিণত হন।
** সিদ্ধান্তমূলক শ্লোক:- “রতি যখন ঊর্ধ্বমুখী, কাম হয় তখন নূর, দেহের মাঝেই আরশ-কুরসি, নেইকো আল্লাহ দূর। নারী-পুরুষ অভেদ হয়ে জ্যোতির দেশে মেশে, মরণ জিতা সাধক হাঁসে অমরত্বের দেশে।”
আপনাদের জন্য আমার শেষ নিবেদন:- আমার এই দীর্ঘ ও গভীর আলোচনা আপনাদের আত্মার খোরাক কিছুটা জুগিয়েছে বলে আমি মনে করি, আমার এই গবেষণা মূলক আলোচনা সমূহ যদি আপনাদের ন্যূনতম আত্মার খোরাক যোগাতে সক্ষম হয়, তাহলেই আমি সার্থক ও তৃপ্ত। আমার এই গবেষণাপত্রটি আপনাদের ডায়েরির শ্রেষ্ঠ পাতায় স্থান দিতে পারেন।
>> আমি এই পুরো আলোচনার একটি সংক্ষিপ্ত ‘বীজমন্ত্র’ বা একটিমাত্র বাক্য তৈরি করে দিচ্ছি, যাহা আপনাদের সারাজীবনের ধ্যানের মূলমন্ত্র হতে পারে বলে আমি দৃঢ়তার সহিত বলতে পারি- ইনশাল্লাহ্।
** আমার দীর্ঘ সাধনা, গভীর উপলব্ধি এবং আমাদের এই মহাজাগতিক আলোচনার সারনির্যাস হিসেবে- আমার আপনার ধ্যানের জন্য সেই ‘বীজমন্ত্র’ বা ‘মূলমন্ত্র’ যাহা আমি নিচে প্রদান করছি:- “রতির দহন শেষে মতির উদয়, আত্মবিলীন প্রেমেই জ্যোতির জয়।”
** বীজমন্ত্র বা মূলমন্ত্রে ব্যাখ্যা:- এই একটি বাক্যের ভেতরেই আমার পুরো গবেষণার তিনটি স্তর লুকিয়ে আছে:
* রতির দহন:- কাম বা জৈবিক তাড়নাকে সাধনার আগুনে পুড়িয়ে বিশুদ্ধ করা।
* মতির উদয়:- প্রজ্ঞা বা ঐশী জ্ঞানের জাগরণ।
* জ্যোতির জয়:- নিজের আমিত্বকে বিলীন করে পরম নূরে একীভূত হওয়া।
>> বিশেষ প্রার্থনা মোর তোমার দুয়ারে:- “হে পরম জ্যোতি, আমার অন্তরের কামকে প্রেমে এবং রতিকে নূরে রূপান্তরিত করো। আমার ক্ষুদ্র ‘আমি’কে তোমার অসীম সত্তায় বিলীন (ফানা) করে দাও এবং আমাকে এমন এক চিরস্থায়ী জীবন (বাকা) দান করো, যেখানে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস তোমারই মহিমা ঘোষণা করে। জগৎতের মোহে নয়, বরং তোমারই নূরের দর্পণে যেন আমি নিজেকে ও তোমাকে একান্তে-ই খুঁজে পাই।”
আপনাদের তরে আমার এই সংক্ষিপ্ত আধ্যাত্মিক যাত্রার সফর সফল হোক। আপনারা যদি ভবিষ্যতে আরও কোনো নিগূঢ়তম রহস্যের গভীরে যেতে চান, তবে আমি আপনাদের সহযাত্রী হিসেবে আপনাদের মাঝে-ই থাকবো- ইনশাল্লাহ্ আল্লাহ্ আজিজ।
এই গবেষণা পত্রের মধ্যে আমি দেহতত্ত্ব রসায়নের তাত্বিকতায় আমার গবেষণা মূলক লেখনী-“রতি থেকে জ্যোতির” আলোচনার সমাপ্তি টানছি। আপনাদের অন্তর ইসলামের প্রকৃত শান্তি ও কল্যাণের আলোক বর্তিকার দিক নির্দেশনার জ্ঞানীও প্রশান্তিতে ভরে উঠুক, এই শুভকামনায় অভিনন্দিত অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়ে দেহতত্ত্বের এই সিরিয়াল ভিত্তিক পর্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি আপাতত পরিসরে, মহান সৃষ্টিকর্তা রব্বুল আলামিন যেন আমাদের সকলের মনোবাসনা পূর্ণ করেন- আমিন।✨🤲

















