সাব্বির আলম বাবু, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বরিশাল বিভাগের ২১ আসন: বিএনপির বিদ্রোহীরাই টার্নিং পয়েন্ট.
বরিশাল বিভাগের ২১ সংসদীয় আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরাই টার্নিং পয়েন্ট। বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি মাঠে রয়েছেন এই দলেরই বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীরা। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ এসব প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তাদের দাবি, দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে কিংবা অভ্যন্তরীণ সমঝোতা ভেঙে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এসব নেতা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের নিজ নিজ এলাকায় রয়েছে ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক প্রভাব এবং সমর্থক গোষ্ঠী। ফলে তারা দলীয় প্রার্থীদের ভোটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বতন্ত্র ছয় প্রার্থীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান, পটুয়াখালী-৩ আসনের হাসান মামুন ও পিরোজপুর-২ আসনের মাহমুদ হোসেন। তারা তিনজনই বিএনপির মনোনীত ও সমর্থিত প্রার্থীদের চেয়ে কম জনপ্রিয় নন। এ ছাড়া বরিশাল-৬ আসনে রয়েছেন মো. কামরুল ইসলাম খান, ঝালকাঠি-১ আসনে মঈন আলম এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবাহান। এই আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. কামরুল ইসলাম খান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আসনের বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন আবদুস সোবাহান। গৌরনদী উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, ‘এখানে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলামেরও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার সোবাহানকে ভোটের মাঠ থেকে সরাতে না পারলে বিএনপির ভোট ভাগ হবে। সেক্ষেত্রে এর সুফল জামায়াতে ইসলামীর ঘরে উঠতে পারে।’
বরিশাল-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম খান। তার দলীয় পদ নেই। তবে এলাকার মানুষ তাকে বিএনপির ঘরানা হিসেবে ভালোভাবে চেনেন।
বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত আসন গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা নিয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩। আসনটি কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ নেই। এই আসনে সরাসরি বিএনপিরও কোনো প্রার্থী নেই। তবে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি নুরুর হক নুরকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। এই সমর্থন নিয়ে নুরুল হক নুর ট্রাক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে দুই উপজেলার বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী ও সমর্থক নুরের পাশে নেই। তারা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, সদ্য বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুনের পক্ষে কাজ করছেন। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মনে করেন, হাসান মামুন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দুই উপজেলার বিএনপির সুখ-দুঃখে সঙ্গী ছিলেন এবং মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাই গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার মানুষ এখন তার পাশে রয়েছেন।
এই আসনের অন্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মুহম্মদ শাহ আলম এবং ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের মো. আবু বক্কর ছিদ্দিকী। বিভাগের অপর আলোচিত আসন পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া, কাউখালি ও স্বরূপকাঠি উপজেলা) আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের বেসামরিক প্রধান, খন্দকার মোশতাক সরকারের সাবেক মন্ত্রী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নূরুল ইসলামের ছেলে ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহমেদ সোহেল মঞ্জুর সুমনকে।
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকের সঙ্গে ভোটের মাঠে রয়েছেন ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মাহমুদ হোসেন। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগদানকারী মাহমুদ হোসেন সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভাইয়ের ছেলে এবং এই আসনে সাতবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই। ফলে পারিবারিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি ব্যাপক পরিচিত। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করায় স্থানীয় রাজনীতিতে তার আলাদা অবস্থান রয়েছে। এদিকে মাহমুদ হোসনের পাশাপাশি এই আসনে বিএনপির সমান শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও রয়েছেন। তারা হলেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শামীম সাঈদী, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ, এবি পার্টির প্রার্থী ফয়সাল খান, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আনিসুর রহমান এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রার্থী মো. মহিবুল হোসেন।
এদিকে ঝালকাঠি-১ আসন (রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা) থেকে বিএনপির প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল ভোটের মাঠে লড়ছেন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এখানে রয়েছেন বিএনপির ঘরানার সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য মঈন আলম (হাঁস প্রতীক) এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাব্বির আহমেদ। তারা সরাসরি বিএনপির কোনো পদে না থাকলেও এলাকায় বিএনপি-সমর্থক হিসেবে পরিচিত।











