রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের শেষ ২৪ ঘণ্টা
১১ রবিউল আউয়াল আনুমানিক দুপুর ১২টায় কয়েকদিনের অসুস্থতার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ কিছুটা সুস্থ অনুভব করেন।
যুহরের নামাজের পর, অর্থাৎ আনুমানিক দুপুর ১.৩০ এ তিনি তাঁর দুই চাচাতো ভাই আলী ও ফদল ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কাঁধে ভর করে মসজিদে যান।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কে মসজিদে আসতে দেখে সাহাবীরা খুশি হন। মসজিদে গিয়ে তিনি ঘোষণা করেন— যার ওপর আমার হক আছে, সে যেন এসে নিয়ে যায়।
তখন সাহাবী উকাশা ইবনে মিহসান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন বদর যুদ্ধের কিসাসের কথা, রাসূলুল্লাহ ﷺ বদরের দিন তাঁকে মিসওয়াক দিয়ে সামান্য আঘাত করেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ অনুমতি দিলে উকাশা অদ্ভুত একটি কাজ করেন!
তিনি ক্ষতিপূরণ হিশেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পেটে চুমু দিলেন!
.
বিকেল ৩.৩০ অর্থাৎ আসরের পর থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আবার অসুস্থতা শুরু হয়।
আস্তে আস্তে জ্বর বাড়তে থাকে। তিনি মাগরিবের নামাজে যেতে পারেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মাগরিবের নামাজের ইমামতি করেন।
রাত ৮টা। এশার নামাজের সময় তিনি ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তীব্র জ্বরে ওঠার সামর্থ্য ছিলো না। অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন!
রাত ১০ টার পর তিনি আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকেন। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পানির পাত্রে হাত ডুবিয়ে তাঁর মুখ মুছে দেন।
আনুমানিক রাত ২ টার পর থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ মিনমিন করে দুআ করতে থাকেন— “আল্লাহুম্মা রফীকুল আ’লা।”
.
১২ রবিউল আউয়াল, ভোর ৫.১৫।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের নামাজের সময় ঘর থেকে পর্দা সরান। সাহাবীদেরকে নামাজে দেখতে পেয়ে তিনি সন্তুষ্টমনে হাসেন। সাহাবীদের মনে হচ্ছিলো রাসূলুল্লাহ ﷺ বুঝি সুস্থ হয়ে ওঠেছেন, তিনি নামাজ পড়াতে আসবেন।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইমামতি ছেড়ে পেছনে আসতে চাইলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বুঝালেন— ইমামতি চালিয়ে যেতে।
তিনি শুধু আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নামাজ চালিয়ে যেতে বলেন, এইদিন জামআতে অংশগ্রহণ করেননি।
তাঁর এই অবস্থা দেখে সাহাবীরা ভেবেছিলেন— এই তো রাসূলুল্লাহ ﷺ সুস্থ হয়ে ওঠেছেন।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নামাজ শেষে চলে যান তাঁর একজন স্ত্রী হাবিবা বিনতে খারিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাড়ি। মসজিদে নববী থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে।
.
ফজরের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারীরিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকে। তিনি চেতন হচ্ছিলেন, আবার অচেতন হচ্ছিলেন।
একবার চেতনা ফিরে পাবার পর দেখতে পেলেন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মিসওয়াক করছেন। তখন তাঁকে বলেন তাঁর জন্য মিসওয়াক নরম করে দিতে।
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মিসওয়াক নরম করে দিলে রাসূলুল্লাহ ﷺ মিসওয়াক করেন।
বলা হয়ে থাকে, এটা ছিলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের বাহ্যিক সর্বশেষ আমল— মিসওয়াক করা।
তখন ঘড়ির কাটায় আনুমানিক সকাল ৮ টা।
.
এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃদুস্বরে উপদেশ দিলেন— নামাজ…নামাজ…নামাজ। তোমরা দাস-দাসীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।
.
১২ রবিউল আউয়াল সকাল আনুমানিক ১০ টা থেকে ১১.৩০।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শরীর দুর্বল হয়ে আসে।
তিনি ছিলেন তখন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কোলে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা উদ্বিগ্ন।
তিনি বুঝতে পারছেন রাসূলুল্লাহর নিঃশ্বাস ভারি হচ্ছে, তাঁর শরীরে ঢলে পড়ছেন।
বারবার তিনি উপরের দিকে তাকাচ্ছিলেন, যেন কিছু দেখতে পাচ্ছেন। আর বলছেন- …রফীকুল আ’লা…।
হঠাৎ আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা খেয়াল করলেন তাঁর কোল ভারী হয়ে আসছে। যেন পুরো শরীর তার কোলে ঢলে পড়লো!
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র দেহ মোবারক নিথর হয়ে আছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই, শরীরের কোনো স্পন্দন নেই!
১৮ বছর বয়সী আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বুঝতে বাকি রইলো না— পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ পৃথিবীর সফর শেষ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন!
ইন্নালিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজীউন!
সাহাবীরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। এইতো ৪-৫ ঘণ্টা আগেও তিনি ফজরের নামাজের সময় পর্দা তুলে তাকিয়ে হেসেছিলেন।
তাঁর হাসি দেখে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুই তো ভেবেছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ সুস্থ হয়েছেন, তিনি চলে গিয়েছিলেন দূরে।
কিন্তু, কে জানতো ফজরের নামাজে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের দিকে তাকিয়েছিলেন, এটাই ছিলো সাহাবীদের দিকে তাঁর শেষ তাকানো!
সাহাবীরা পাগলের মতো চারিদিকে ছুটছেন। বুঝতেই পারছেন না কী হলো।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তো মসজিদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন— যে বলবে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করেছেন, তাকে এই তরবারি দিয়ে হত্যা করবো!
অনেকেই ভাবছে, এটা বুঝি উহুদ যুদ্ধের সেই গুজবের মতো। রাসূলুল্লাহ ﷺ আবার উঠে দাঁড়াবেন। তিনি কীভাবে ইন্তেকাল করতে পারেন!?
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- “যে দিন নবী ﷺ আমাদের মাঝে এসেছিলেন, সেই দিনের মতো উজ্জ্বল দিন আর কখনো দেখিনি।
আর যে দিন তিনি ইন্তেকাল করলেন, সেই দিনের মতো অন্ধকার দিনও আর কখনো দেখিনি!”
১২ রবিউল আউয়াল আনুমানিক সকাল ১০-১১.৩০ এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করেন।
অর্থাৎ যুহরের নামাজের আগেই।
.
চিন্তা করুন, তাঁর ইন্তেকালের পর যুহরের আযান দিতে গিয়ে কী অবস্থা হয়েছিলো বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর?
‘আসহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলার পর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান!
কেনোই বা পড়বেন না?
গত ১০ বছর ধরে প্রায় ১৮,২৫০ ওয়াক্ত নামাজের আযান দেবার সময় যখন বলতেন ‘আসহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর আশেপাশেই থাকতেন।
আর এবার যখন আযান দিতে গেলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়ার বুকে নেই!
চিন্তা করুন, কেমন ছিলো সাহাবীদের সেদিনের মানসিক অবস্থা!
আল্লাহ যদি আত্মহত্যা ‘হালাল’ করতেন, সেদিন কয়েকশো সাহাবী কি সেই পথ বেছে নিতেন?
সাহাবীদের জীবনে সেই দিনটি ছিলো তাদের সবচেয়ে সবচেয়ে কষ্টের দিন!
কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না!
যিনি ছিলেন তাঁদের সবচেয়ে প্রিয়, তিনি নেই!
কীভাবে তারা সহ্য করলেন!
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

















