বিশ্ব এইডস দিবস আজ
প্রতি বছর ১লা ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালিত হয়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এইচআইভি/এইডসের সমস্যা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই দিনটি সেই সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ, যাদের আমরা এই রোগে হারিয়েছি এবং যারা এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশের দিন।
২০২৫ সালের মূল বার্তা ‘চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে, নতুনভাবে এইডস প্রতিরোধ গড়ে তোলা’ – যা দেখায় যে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং স্বাস্থ্যখাতে অর্থের ঘাটতি আমাদের অগ্রগতিকে ধীর করে দিয়েছে। তবে এই বার্তা একই সঙ্গে আশা জাগায় যে আমরা চাইলে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক এইডস প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রোগী শনাক্তের দিক থেকে ঢাকার পরে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। এর পরে চট্টগ্রাম বিভাগ। তবে সম্প্রতি সিরাজগঞ্জে অস্বাভাবিক হারে এইডস রোগী শনাক্ত হচ্ছে। গত এক বছরে সেখানে ১৪৪ জন এইডস রোগী মিলেছে। যাদের ৯৮ শতাংশই সুঁই-সিরিঞ্জের মাদকসেবী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটির প্রতিরোধ সম্পর্কে ৯৫ ভাগ মানুষকে সচেতন করতে হবে। শনাক্ত হওয়া ৯৫ শতাংশ রোগীকে এআরটি সেন্টারের মাধ্যমে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। ৯৫ ভাগ এআরটি সেবাগ্রহীতা রোগীর দেহে ভাইরাল লোড ৫০ কপি প্রতি মিলিলিটারের নিচে আনতে হবে। এ তিনটি অর্জন সম্ভব হলে রোগটির নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
দেশে বর্তমানে অনুমিত রোগীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৬০০। তবে ১৯৮৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এইডস শনাক্ত হওয়া চিহ্নিত রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭০৮ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৮২০ জন। বর্তমানে রোগটি প্রাদুর্ভাবের হার ০.০১ শতাংশের কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য থেকে বোঝা যায় যে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ আছে। ২০২৪ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে ছিলেন।
একই বছরে ১৩ লাখ নতুন সংক্রমণ এবং প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে এইডস-সংক্রান্ত জটিলতায়। যদিও এই সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় অনেক কমেছে, তবুও এখনও প্রায় ৯২ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে না। জাতিসংঘের এসটিডি/এইডসবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউএন এইডসের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতিদিন সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ৫০০ জনেরই বয়স ১৫ বছরের নিচে। আক্রান্ত ৩২ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের নিচে, যার ২০ ভাগই নারী। আক্রান্তদের ৬১ ভাগ সাবসাহারা আফ্রিকান অঞ্চলে বসবাসকারী।
এদিকে বিশেষ করে শিশু, কিশোর-কিশোরী, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বোঝা যায়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনও আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা।
২০২৫ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল আমাদের নতুন আশার আলো দেখায়। দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন ভিত্তিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ এখন অনেকের জন্য সহজ ও টেকসই চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি নতুন মডেলের গবেষণা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণের হার আরও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করছে, যা সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে অর্থসংকট ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ অগ্রগতিকে আটকে দিতে পারে, এবং বৈশ্বিক ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই ২০২৫ সালের বিশ্ব এইডস দিবস আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতার কারণে আমরা অনেক সাফল্য অর্জন করেছি, কিন্তু সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে এবং বৈষম্য দূর না হলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এইডস মোকাবিলা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়— এটি মানবিক অধিকার, ন্যায়, সমতা এবং সম্মানের বিষয়। এই দিনে আমরা সেই সব মানুষকে স্মরণ করি যারা আর আমাদের মাঝে নেই, যারা এইচআইভি নিয়ে লড়াই করছেন তাদের পাশে দাঁড়াই, এবং প্রতিজ্ঞা করি যে একসঙ্গে কাজ করলে একদিন আমরা এইডস-মুক্ত পৃথিবী গড়তে পারব।












