জেমস আব্দুর রহিম রানা
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধ: নিরাপত্তার নামে গণতন্ত্রকে নীরব করার আয়োজন
ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তটি কেবল অযৌক্তিকই নয়, এটি সরাসরি নাগরিক অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিরাপত্তার অজুহাতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে ভোটারকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই নিষেধাজ্ঞার অর্থ দাঁড়ায়—ভোট দিতে যেতে হলে একজন নাগরিককে নিজের মোবাইল ফোন ঘরে রেখে যেতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এমন নির্দেশনা শুধু অবাস্তবই নয়, বরং ভয়ংকরও। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে ভোটার কিংবা সংশ্লিষ্ট কেউ তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে জানাতে পারবে না। এটি ভোটাধিকার প্রয়োগকে উৎসাহিত করার বদলে নিরুৎসাহিত করবে—বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করা ভোটারদের ক্ষেত্রে।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মোজো সাংবাদিকতা ও সিটিজেন জার্নালিজমকে কার্যত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে দেখা গেছে, নির্বাচনী অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট কিংবা প্রভাব বিস্তারের মতো ঘটনাগুলোর অনেকটাই প্রথম সামনে এসেছে সাধারণ মানুষের বা মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের মোবাইল ভিডিওর মাধ্যমে। সিসি ক্যামেরা থাকলেও সেগুলো নিয়ন্ত্রিত, অনেক সময় অকার্যকর এবং তাৎক্ষণিক জনসমক্ষে আসে না। বরং ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনই ছিল গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত নজরদারি মাধ্যম।
প্রশ্ন হলো—যদি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তবে মোবাইল ফোনে ভয় কোথায়? অনিয়ম বা জালিয়াতির কোনো ইচ্ছা না থাকলে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনই বা কেন? বরং এই নিষেধাজ্ঞা সেই সন্দেহকেই জোরালো করে যে, ভোটকেন্দ্রে কী ঘটছে তা জনসমক্ষে আসুক—এটা কেউ চায় না।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়। সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের চোখ-কান বন্ধ রাখলে নির্বাচন যে প্রশ্নবিদ্ধ হবে—সে বাস্তবতা নির্বাচন কমিশনের অজানা থাকার কথা নয়। তবু এমন সিদ্ধান্ত কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের কাজ ক্ষমতাকে রক্ষা করা নয়, ভোটারকে সুরক্ষা দেওয়া। মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করে সেই সুরক্ষার জায়গাটিকেই দুর্বল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে এটি শুধু ভোটার বিমুখতা বাড়াবে না, ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থার শেষ অবশিষ্ট অংশটুকুও ক্ষয় করবে।
অতএব, অবিলম্বে ভোটকেন্দ্রের চারশ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মুক্ত গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিক নজরদারি ছাড়া কোনো নির্বাচনই প্রকৃত অর্থে সুষ্ঠু হতে পারে না।
নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা প্রয়োজন—নীরবতা কখনোই গণতন্ত্রের নিরাপত্তা নয়; বরং তা স্বৈরতন্ত্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর।


















