এস এম শিমুল কলেজ শিক্ষক, লেখক-সাহিত্যিক ও ফিচার কলামিস্ট
তিন বোনের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি: অনলাইন গেমের মরণফাঁদ ও বিপন্ন শৈশব
ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে ঘটে গেল এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি। গত বুধবার একই পরিবারের তিন নাবালিকা বোন—বিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২) একটি ৯ তলা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে। এই নিথর দেহগুলো শুধু তিনটি কিশোরীর মৃত্যু নয়, বরং আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার এক চরম পরাজয়ের দলিল। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ সত্য—এই তিন বোন একটি কোরিয়ান অনলাইন গেমের প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত ছিল। করোনাকালে শুরু হওয়া সেই আসক্তি তাদের এতটাই গ্রাস করেছিল যে, তারা স্কুল ছেড়ে দিয়ে নিজেদের বাস্তব সত্তা ভুলে গেমের চরিত্রের নামে নিজেদের পরিচয় দিতে শুরু করেছিল। তাদের এই মর্মান্তিক প্রস্থান আমাদের জন্য রেখে গেছে এক গভীর শোক ও কঠিন সতর্কবার্তা।
গভীর অণুবীক্ষণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই আসক্তি কোনো সাধারণ শখ ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের ‘ডিজিটাল হিপনোটিজম’ বা ভার্চুয়াল সম্মোহন। গেমের আসক্তির কারণে তাদের জীবনযাপন হয়ে পড়েছিল অস্বাভাবিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। খাওয়া, ঘুমানো, গোসল—সবই তারা একসঙ্গে করত। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগত কোনো কিশোর বা কিশোরীর কাছে বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে, তখন তারা বাস্তব বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। এই তিন বোনের ক্ষেত্রেও হয়তো গেমের কোনো কাল্পনিক জগত তাদের প্ররোচিত করেছিল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন কোনো ‘লেভেল’ বা স্তরে পৌঁছাতে। ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুটে কান্নার ইমোজিসহ লেখা ছিল— “Sorry, Baba”। এই দুটি শব্দে যেমন বাবার প্রতি ভালোবাসা আছে, তেমনি লুকিয়ে আছে এক অসহায় অন্ধকার থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুতি।
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং গেম আসক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। করোনাকালীন ঘরবন্দি সময় সন্তানদের হাতে আমরা যে মোবাইল তুলে দিয়েছিলাম, তা আজ অনেকের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানকে শাসন করার আগে তাদের বুঝতে শেখা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। পরিবারে প্রায়ই এ নিয়ে কলহ হতো বলে জানা গেছে; কিন্তু সেই কলহ তাদের গেম থেকে ফেরাতে পারেনি, বরং হয়তো আরও বেশি কোণঠাসা করে তুলেছিল। আমাদের বুঝতে হবে, প্রযুক্তির নেশা থেকে সন্তানকে ফেরাতে হলে ধমক নয়, বরং তাদের সময় দেওয়া এবং বিকল্প বিনোদন তৈরি করা জরুরি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এই লেখনীর মাধ্যমে আমার বিশেষ বার্তা—জীবন কোনো অনলাইন গেম নয় যে ‘রিস্টার্ট’ করা যাবে। জীবন এক অনন্য উপহার, যা একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভার্চুয়াল জগতের মায়া কাটিয়ে বাস্তব পৃথিবীর ঘাস, মাটি আর মানুষের স্পর্শে ফিরে আসতে হবে। অভিভাবকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ—সন্তানের হাতে শুধু মোবাইল নয়, নিজের অমূল্য সময় দিন। তাদের কথা শুনুন, তাদের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করুন। সন্তানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করুন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে, তবে তা যেন নজরদারি না হয়ে সহমর্মিতা হয়।
গাজিয়াবাদের এই তিন বোনের মৃত্যু যেন শেষ শোকবার্তা হয়। আমাদের সচেতনতার অভাবে আর কোনো কিশোর-কিশোরী যেন এভাবে আত্মাহুতির পথ বেছে না নেয়। দেরি হওয়ার আগেই আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এখন বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। শোকাহত এই পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং আশা করি এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দর শৈশব ফিরিয়ে দিতে সচেষ্ট হব।

















