আমার মা
ঈশ্বর আমাকে পাঠাতে পারতো বিল গেটসের স্ত্রীর গর্ভে। নয়তো পদ্মার পাড়ের কোন জেলের স্ত্রীর গর্ভে আমার বেড়ে ওঠা হতো জল আর মাছের সাথে। কিন্তু ঈশ্বর আমাকে পাঠিয়ে দিলো এক নিন্মবিত্তের স্ত্রীর পেটে। এখানে আমার বেড়ে উঠা হয়েছে বন্ধুদের দামী কাপড়ের দিকে চেয়ে থেকে আর পাশের বাড়ীর ভালো তরকারির গন্ধে জোরে জোরে নাক টেনে টেনে।এই পরিবারে আমি ছোট্ট থাকতেই অনেক কিছু বুঝতে শিখে গেছি। কেমন করে আমার বুদ্ধিমতি মা নিজের প্লেটের ভাত বাবার প্লেটে দিয়ে বাবার প্লেটের ভাতগুলোতে পানি দিয়ে রেখে দেয়,সকালে তার সোনা মানিক খাবে বলে।উপোষ মা আমার রাত জাগে কখন সকাল হবে।মা আমার বই পড়তে পারেনা অংক করতে জানেনা।আমিতো পড়াশোনা করিনা তাই মাকে জোরে জোরে কবিতা পড়ে শুনানো হয়নি কখনো।পাশের বাড়ীর ছেলেমেয়ে গুলো সন্ধ্যা হলেই জোরে জোরে বই পড়তে বসে।আমার দিকে মা অবাক চোখে চেয়ে থাকে হয়তো মনে মনে বলে কিরে ইকবাল তরে বুঝি বই পড়তে ইচ্ছে করে?কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বন্ধুদের সাথে দৌড় স্কুল যেতে ইচ্ছে করে।মা হয়তো এসব বলে আমি গুনিনা মায়ের মনের কথা।পাশের বাড়ীর কলেজ পড়ুয়া মিনু নামের মেয়েটা উঠোনে দাড়িয়ে কি যেন পড়ে ওনার পড়া শুনে আমার মায়ের চোখে জল টলমল করে আমার ইচ্ছে করে মেয়েটাকে ইচ্ছে মতো পিটিয়ে আসি।আবার ভাবি মেয়েটা বই পড়ছে হাসতে হাসতে কিন্তু আমার মা কাঁদে কেন?আমিও কান পাতি দেখি কি পড়ে।মেয়েটি পড়ে।ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্য ময় পূর্ণিমার চাদ যেন ঝলসানো রুটি।ধুরো ওনি কিচ্ছু বুঝেনা। পড়তেই জানেনা।আমি রাতে অনেক বার চাঁদ দেখছি কই রুটির মতো তো লাগেনি? আমার মাও কিন্তু জোরে জোরে বলতো।আমার কালো মানিক চাঁদের চেয়েও সুন্দর। আমি বুইজ্জা লাইছি ওনি হিংসা করে চাঁদকে রুটি বানিয়ে ফেলছে।সকাল হতেই আমার মা সেই পানি দেওয়া ডেক থেকে মুটোয় মুটোয় ভাত তুলে আনে খালি গায়ে আমি পাশে বসে দেখি। আরে আমার মা তো যাদু জানে কেমন সাদা সাদা ভাত তুলে আনলো।পেলেটে পাশে একটু লবন রেখে মা যায় দু একটা শুকনো মরিচ পোড়তে মরিচের ঝাঁজে মায়ের চোখ জ্বলে মায়ের চোখের জল দেখতে কেমন জানি হিরে মনি মুক্তর মতো লাগে।আচ্ছা হিরে মনি মুক্ত কি আমার মায়ের চোখের জলের চেয়েও দামী?।মা আসে পাশে বসে টিপে টিপে মরিচ সাথে লবন ভাত মিশায়।আমার মা জানি কেমনে এমন অমৃত খাবার বানিয়ে ফেলে। মা বলে ইকবাল তুই হাত দেইসনা জ্বলবে তুর হাত। আয় বাপ আমি খাইয়ে দেই।আমার মাথায় হাত বুলায়, কপালে গালে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে থাকে। এতো জল আকাশেও নেই আমার মায়ের চোখে যতো জল।মা বাপ তুই আরেকটু বড় হলেই আমাদের আর অভাব থাকবেনা।তখন অনেক বড়বড় মাছ কিনে আনবি যে মাছের লেছ মাটিতে গড়াগড়ি দিতে দিতে বাড়ী আসবে।তখন আমি এতো বড় মাছ উঠোনে রেখে কাটবো গায়ের লোক চাইয়া থাকবো দেইখা।তখন আমি সবাইকে বলবো আমার সোনামানিক বড় হয়ে গেছে আমাদের আর অভাব নাই।টিনের চালের ফুটা দিয়ে আাকাশ দেখেই আমার মা বুঝতে পারে কেমন জোরে বাতাস আইবো বৃষ্টি পানিতে উঠোন কতোটুক ভরবো।তাইতো মা আমাদের মুরগির মতো আগলে রাখে।ছেড়া শাড়ীর আঁচল দিয়া বুকে শক্ত করে ধইরা রাখে,আর চিন্তায় অস্তির হয় যদি মেঘের পানি শরীরে ভিজাইয়া লায় আর জ্বর ঠান্ডা লাগে তাদের বাপে ঔষধ আনবো কই থেইকা চালইতো আনতারে না ঠিকমতো।ঠাডা পরার শব্দে যতটা কাঁপে মাটি গাছগাছালি তারচেয়ে বেশী কাঁপে আমার মায়ের বুক।মা ভাবে না জানি আমার বুকের ধন একটা কাইরা নেয় তাইলে বাঁচবো কেমনে।আমার মা উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছ, বরই গাছ কামরাঙা গাছ বেল গাছের শুকনো পাতা ঝাড়ু দিয়ে জমিয়ে রাখে রান্না করবে বলে।আর পাতার সাথে কথা বলে আমার অল্প বয়সের জামাই খুব বুদ্ধিমান আছিল।অভাবের সংসার তার কি করে তার কিশোরী বউডারে ফলমুল কিনে খাওয়াবে?তাই আমি এই বাড়ীতে আসার পরই জামাই বুদ্ধি করে গাছ গুলো লাগাইছিল যেন তার আদরের বউডায় শশুর শাশুড়ির চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের মতো করে কিছু ফল খাইতে পারে।আমার মা এখন দরজায় দাঁড়িয়ে পাকা আম,আর বেলের তাকিয়ে থাকে চিন্তা করে।আমার ছোডো পোলাটার কি তার বাপের কথা মনে আছে?কেমনে মনে থাকবো ছোটো রাইখাইতো মইরা গেছেগা।আহারে আমার ছোডো পোলাডায় কতোইনা আম খাইতে পারতো।পেকে হলদে হওয়া আম বেল, জাম গাছে বসে বইয়া বইয়াই খাইতো।বাতাস আসলে গাছের ডালের সাথে পোলাডায়ও দুলতো।গাছের মগডালে মগডালে উঠতো।তারে যদি কইতাম বাপরে এতো উপরে উডিসনা ডাল ভাইঙা পইরা যাবিগা।পোলায় রেগে গিয়ে বলতো। তর বাপেরটা ভাঙবো?আমি তর বাপের গাছে ওঠছি নাকি তর বাপেরটা খাই।আমার বাপের গাছ ভাঙবো আমি আমার বাপেরটা খাই গাছে খামো নাকি ঘরে খামো তুই কওয়ার কেডা?আমার মা ভাঙাচোরা ঘরে না খেয়েও হাসতো। আমার বাপের ভাঙাচোরা ঘরে এখন ইট বসেছে কিন্তু আমার এখন আর হাসেনা।আমার সেই প্রাণচঞ্চল কিশোরী মা আজ বৃদ্ধ হয়ে গেছে।আমার বাপে বিয়ে করে আনা সেই ছোট্ট কিশোরী বধূ আজও আমার বাপের ভিটা আগলেই রেখেছে।আচ্ছা মাকে একবার জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়?আচ্ছা মা আব্বায় কি কোনদিন তর হাত ধরে ইটাখোলায় ঘুরেছিল?ফুল এনে কি কখনো তোর খোঁপায় গুজে দিয়েছিল?কিংবা তোই কি কখনো আব্বাকে বলেছিলি।আমারে একদিন সিনেমা দেখাইতে নিয়া যাইবেন?এসব বলতে আমার খুব ইচ্ছে করে মাকে।কিন্তু আর জিজ্ঞেস করা হয়না কারন বুঝ হবার পর থেকেই দেখি আমার মায়ের দৌড়াদৌড়ি উঠোন, রান্নাঘর আর আমাদের সামলানো।এর বাইরে আমার মায়ের আর কোন জগৎ হয়তো ছিলনা।আমার মায়ের মাথায় এখন বক সাদা চুল দেখলেই মনে হয় মার মাথায় বুঝি সাদা কাশফুলের বন।আচ্ছা আমার মায়ের মাথায় কি একসময় কোমড় ছাড়িয়ে যাওয়া চুল ছিল।এবার মাকে জিজ্ঞেস করেই নিবো।আচ্ছা মা আব্বায় কি তুর মাথায় এতো লম্বা লম্বা চুল দেখে কোন কবিতা লিখছিল?হয়তো আমার মা ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে বলবে।তর বাপ সারা জীবনে সংসারই বুঝলোনা আর কবিতা লেখবো।আমার মায়ের বয়স বাড়েনি বেড়েছে দুঃচিন্তা।।











