দ্য টেলিগ্রাফ থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ
জয়ের পথে ইরান
গত তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী ইরানের আকাশে অনবরত বোমাবর্ষণ করে চলেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ইসলামিক রিপাবলিককে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। এত কিছুর পরও আশ্চর্যজনক শোনালেও সত্য যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের সামনে এই যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ হওয়ার একটি স্পষ্ট পথরেখা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠকারিতা এবং রণকৌশলের ভুলগুলোই মূলত ইরানের এই জয়ের পথকে প্রশস্ত করেছে, যার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর।
প্রথমত, যেকোনো মূল্যে টিকে থাকাই ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের আসল বিজয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানিদের ‘মুক্তির সময় এসেছে’ বলে অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিলেন। ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বহু শীর্ষ কমান্ডার ও মন্ত্রী নিহত হয়েছেন। কিন্তু শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এখন কার্যত দেশটির ভাগ্যবিধাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতক্ষণ না লাখো মার্কিন সেনা ইরানে সরাসরি স্থল অভিযান চালাচ্ছে, ততক্ষণ কোনো গণবিপ্লব ছাড়া এই শাসনের পতন সম্ভব নয়। এমনকি নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প এখন ইসলামিক রিপাবলিকের পতনের চেয়ে পর্দার আড়ালে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে চুক্তির পথ খুঁজছেন। কেননা ইরান টিকে গেলে সেটি হবে তাদের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়।
দ্বিতীয়ত, ইরানের দ্বিতীয় বড় শক্তি হলো বিশ্বের অর্থনীতির অন্যতম ধমনি ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে এক চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হচ্ছে, যেই দেশটিকে তিনি কিছুদিন আগেও ‘নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ’ করার হুমকি দিয়েছিলেন। এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানকে যুদ্ধের ময়দানে এক বড় দর-কষাকষির হাতিয়ার তুলে দিয়েছে।
তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে এক নতুন আয়ের উৎস করে দিয়েছে। দেশটি বর্তমানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কোন জাহাজ এই পথ দিয়ে যাবে আর কোনটি যাবে না। অভিযোগ রয়েছে, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো নিরাপদে প্রতিটি তেলবাহী জাহাজ পার করার জন্য ইরানকে ২০ লাখ ডলার করে ফি দিচ্ছে। এমনকি তেলের বাজারে বড় বিপর্যয় এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সমুদ্রে থাকা ইরানের ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রির সুযোগ দিয়েছে। ট্রাম্প এখন হরমুজ প্রণালি ‘যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ’ করার প্রস্তাব দিচ্ছেন। এটি ইরানের জন্য এক অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করেছে; যে প্রণালি দিয়ে আগে জাহাজ চলাচলে ইরান এক পয়সাও পেত না, এখন সেখান থেকে তারা নিষেধাজ্ঞামুক্ত এক বিশাল রাজস্ব আয়ের স্বপ্ন দেখছে।
চতুর্থত, যদি ইরান এই যুদ্ধে টিকে যায় এবং হরমুজ প্রণালি থেকে নতুন করে অর্থ উপার্জন করতে পারে, তবে তারা সেই অর্থ দিয়ে তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সক্ষমতা পুনরায় তৈরি করতে পারবে। যদিও নেতানিয়াহু দাবি করছেন, তাঁরা ইরানের অস্ত্রশিল্পের ভিত্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় পেলে ইরান আবারও সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম। হয়তো এই সক্ষমতা ফিরে পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে এবং ততদিনে ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকবেন না, কিন্তু তাঁরা তাদের উত্তরসূরিদের জন্য এক চরম শক্তিশালী ইরানকে রেখে যাবেন।
পরিশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধ ইরানকে হয়তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে এবং দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। জনগণের তীব্র ক্ষোভ হয়তো ভবিষ্যতে এই শাসনের পতন ঘটাতে পারে, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে থাকাটাই ইরানের কাছে এক বড় বিজয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

















