কাজল ইব্রাহিম
রেকর্ড জটিলতায় শতভাগ জমি নিয়ে বিরোধ: শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে দখল
জামালপুর ব্রিটিশ কাচারীর আওতাধীন মোহনগঞ্জ মহাকুমার অন্তর্গত উমানাথ চক্রবর্তী কাচারির একটি জমি সংক্রান্ত জটিল বিরোধ বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জমির সিএস রেকর্ড অনুযায়ী খতিয়ান নং ১৫০, মূল দাগ নং ৪০০ এবং পার্শ্ববর্তী দাগ নং ৩৭২সহ মোট জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন ঘাঠু শেখ ও হাটু শেখ গং। উক্ত জমির মধ্যে দাগ নং ৩৭০, ৩৭১ ও ৩৭২ অনুযায়ী যথাক্রমে ৪৫ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ জমি বিভিন্ন খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সিএস অনুযায়ী প্রকৃত দখলদার ছিলেন হাটু শেখ ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারগণ। পরবর্তীতে উক্ত মালিকগণ ৯২২৭ নং সাব-রেজিস্ট্রেশন দলিলের মাধ্যমে মো. কান্দু শেখের নিকট জমি বিক্রি করেন। কান্দু শেখের মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র জালাল উদ্দিন মন্ডল এবং চার কন্যা—রহিতন, সহিতন, আফিরন ও তাফিরন—ওয়ারিশ হন এবং পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত জমির অংশ জালাল উদ্দিনের পুত্র ও ভাতিজা ইদ্রিস আলীর নিকট হস্তান্তর করা হয়।
জালাল উদ্দিন মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৬০ শতাংশ জমি ভোগদখল করে আসেন এবং তার মৃত্যুর পর স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাগণ উত্তরাধিকারসূত্রে উক্ত জমি ভোগদখল অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ১৫-০৪-২০১৮ তারিখে খারিজের জন্য স্থানীয় ভূমি অফিসে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান যে, কান্দু শেখ ও জালাল উদ্দিনের নামে আরএস (ROR) ও বিএস (BRS) রেকর্ড না থাকায় খারিজ প্রদান সম্ভব নয়। তাহলে কি মূল মালিকানার ধারাবাহিকতা কোথাও বিঘ্নিত হয়েছে? পরবর্তীতে অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয় যে, আরএস রেকর্ডে খতিয়ান নং ৮৫৬ ও ৮৬১ অনুযায়ী দাগ নং ৫৯৬, ৫৯৭, ৫৯৮ ও ৫৯৯ জমি শ্যাম লাল মাল্লা ও সুরেশ চন্দ্র পালের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে, যা মূল মালিকানা ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রশ্নের উদ্রেক করে।
এর মধ্যে শ্যাম লাল মাল্লা ৪৭ শতাংশ জমি রেকর্ড পান এবং উক্ত জমির ৩৩ শতাংশ ১৮-১২-১৯৬৪ তারিখে ২৮৯৬ নং দলিলের মাধ্যমে শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের নিকট বিক্রি করেন। পরবর্তীতে শ্যাম লাল মাল্লার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইন্দ্র লাল মাল্লা ২৪-১২-১৯৭৯ তারিখে ২০৩৫৫ নং দলিলের মাধ্যমে একই দাগে ১ একর ১.৪৬ শতাংশ জমি বিদ্যালয়ের নিকট সাব-কবলা প্রদান করেন, যদিও তার পিতার নিকট অবশিষ্ট জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। তাহলে অতিরিক্ত প্রায় ১৩২ শতাংশ জমি বিক্রির বৈধতা কোথায়? এটি কি সুস্পষ্ট আইনগত অসংগতি নয়? এই বিষয়টি জালিয়াতির ইঙ্গিত বহন করে কি না—সে প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। অন্যদিকে, সুরেশ চন্দ্র পালের নামে রেকর্ডকৃত ১১ শতাংশ জমি ওয়ারিশবিহীন হওয়ায় সরকারি খাসে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে তা স্থানীয় কানু শেখের নিকট লিজ প্রদান করা হয়; বাকি ২ শতাংশ জমির কোনো সুস্পষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায়নি—এটিও কি আরেকটি প্রশাসনিক শূন্যতা নির্দেশ করে?
পরবর্তীতে বিএস জরিপে শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে খতিয়ান নং ৫, দাগ নং ৪০৮-এ ৪৩ শতাংশ জমি রেকর্ড হয়; একই সঙ্গে ১২ শতাংশ জমি খতিয়ান নং ৫৮৮ অনুযায়ী আব্দুর রহমানের নামে এবং ৫ শতাংশ জমি খতিয়ান নং ৯০২ অনুযায়ী কানু শেখের ওয়ারিশদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। এদিকে সিএস খতিয়ান নং ১৫০ অনুযায়ী দাগ নং ৪০০-এর ৮১ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিক হাটু শেখ ও তার ওয়ারিশগণ—মোহর মন্ডল, যহর মন্ডল ও কান্দু মন্ডল—বর্তমানে এই অংশের উত্তরাধিকারী; অথচ উক্ত ৮১ শতাংশ জমির উপর শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মিত রয়েছে, যেখানে বিদ্যালয়ের কোনো বৈধ দলিল নেই বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তাহলে বৈধ দলিল ব্যতীত এই দখল কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো? পাশাপাশি দাগ নং ৩৭০, ৩৭১ ও ৩৭২-এর আওতাধীন প্রায় ৬০ শতাংশ খালি জমি, যা মামলা নং ১৬৮/২০১৮ (পরবর্তীতে ৭২৬/২০২১) হিসেবে বিচারাধীন, সেখানে সম্প্রতি স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে জোরপূর্বক দখল ও প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন ইদ্রিস আলী মন্ডল গং; বাধা প্রদান করলে তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে—এটি কি আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন নয়?
বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার মালিকানার অতিরিক্ত জমি বিক্রি করতে পারে না এবং বৈধ অধিগ্রহণ ব্যতিরেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জোরপূর্বক দখল দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে ইদ্রিস আলী মন্ডল গং প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের নিকট সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, আদালত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নিকট প্রয়োজনবোধে ৮০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত দলিলপত্র উপস্থাপন করা সম্ভব। তাহলে কি এখনই যথাযথ তদন্ত ও দাগ-রেকর্ডের সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন নয়? তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃত মালিকানা যাচাই সাপেক্ষে বৈধ ওয়ারিশদের জমি ফেরত প্রদান, জবরদখল ও হুমকির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার ওপর সংঘটিত মানহানি ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘদিনের এই জটিল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যথাযথ রেকর্ড যাচাই, দাগ সমন্বয় নিরূপণ এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ই একমাত্র স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে সক্ষম—এটি কি এখন সময়ের অনিবার্য দাবি নয়?











