✍️ জাহারুল ইসলাম জীবন এর লেখা ও সম্পাদনায় রচিত নারী ও পুরুষের দেহতত্ত্বের গবেষণা
রতি থেকে জ্যোতি: দেহতত্ত্ব ও লতিফা সাধনার আধ্যাত্মিক রসায়ন
দেহতত্ত্ব ও তাসাউফ শাস্ত্রের এই নিগূঢ় তত্ত্বটি অত্যন্ত চমৎকার এবং সুশৃঙ্খলিত। আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে স্থূল দেহকে (Physical Body) সূক্ষ্ম দেহে (Subtle Body) এবং কামকে (Lust) নূরে (Divine Light) রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি মূলত ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানুষ তথা মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষ হওয়ার পথ। বলাবাহুল্য যে, তাসাউফ বা সুফিবাদ কেবল তাত্ত্বিক কোনো দর্শন নয়, বরং এটি দেহ-মন ও আত্মার এক সমন্বিত ধর্ম তাত্বিক বাস্তব সম্মত বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ভেতরে সুপ্ত থাকা পাশবিক প্রবৃত্তিকে স্বর্গীয় জ্যোতিতে রূপান্তরিত করা। এই রূপান্তরের প্রধান সোপান হলো ‘লতিফা’ এবং এর জ্বালানি হলো দেহের ‘পঞ্চরস’।
নীচে লতিফা সমূহ ও পঞ্চরসের উপর আপনাদের সমীপে আলোচনা করা হলো:
**১. সপ্ত লতিফা:> আধ্যাত্মিক উত্তরণের সাতটি তোরণ কেবল মানুষের দেহে রক্ত-মাংসের আধার নয়, বরং এটি সাতটি লতিফা বা সূক্ষ্ম শক্তি কেন্দ্রের এক অপূর্ব বিন্যাস। সাধক যখন কামের স্তর থেকে নূরের স্তরে আরোহণ করেন, তখন তাকে এই সাতটি তোরণ অতিক্রম করতে হয়:-
* লতিফায়ে নফস (নাভি):- এটি প্রবৃত্তি ও কামনার মূল কেন্দ্র। এর রঙ্গ নীল। সাধনার প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় এখান থেকেই-যাকে বলা হয় ‘জেহাদে আকবর’।
* লতিফায়ে কলব (হৃদয়):- বাম স্তনের নিচে অবস্থিত এই কেন্দ্রের রঙ্গ লাল। এটি প্রেমের জন্মভূমি। এখানে এসে কাম-ভাবনা প্রথম প্রেমে রূপান্তরিত হওয়ার দীক্ষা পায়।
* লতিফায়ে রুহ (আত্মা):- ডান স্তনের নিচে অবস্থিত এই কেন্দ্রের রঙ্গ হলুদ। এটি আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রবেশ দ্বার।
* লতিফায়ে সিরর/সের/ছের (রহস্য):- বাম স্তনের ওপরে অবস্থিত সাদা রঙের এই কেন্দ্রে সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হয়।
* লতিফায়ে খফি (গোপন):- ডান স্তনের ওপরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি কালো রঙ্গের। এখানে সাধক আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য অনুভব করেন।
* লতিফায়ে আখফা (অতি গোপন):- বুকের মাঝখানে অবস্থিত সবুজ রঙ্গের এই কেন্দ্রটি হলো ‘ফানা-ফিলাহ’ বা ‘পরম সত্তায়’ বিলীন হওয়ার স্তর।
* লতিফায়ে সুলতানুল আজকার (মস্তিষ্ক):- এটি ব্রহ্মতালু বা জ্যোতি দেশ। এখানে সব লতিফার নূর একত্রিত হয়ে সাধককে নূরের মহাসমুদ্রে নিমজ্জিত করে।
**২. পঞ্চরস ও লতিফার আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন
দেহের পঞ্চরস-সোডিয়াম, কার্বোনেট, নাইট্রোজেন, সালফার ও ফসফরাস-কেবল রাসায়নিক উপাদান নয়, বরং এগুলো সাধনার মূল কাঁচামাল।
* শোধন প্রক্রিয়া:- জিকির ও ধ্যানের স্পন্দনে লতিফায়ে কলব ও নফসে এক ধরনের আধ্যাত্মিক দহন তৈরি হয়। এর ফলে সোডিয়াম ও ফসফরাসের মতো উপাদানগুলো জৈবিক উত্তাপ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক শক্তিতে পরিণত হতে থাকে।
* উর্ধ্বগমন:- সাধারণ অবস্থায় এই রস নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে ক্ষয় হয়। কিন্তু ‘দমের চাবিকাঠি’ বা শ্বাসক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে সাধক এই রসকে ঊর্ধ্বগামী করেন।
* রূপান্তর:- যখন এই পঞ্চরস লতিফায়ে আখফা অতিক্রম করে মস্তিষ্কে (সুলতানুল আজকার) পৌঁছায়, তখন তা আর তরল থাকে না; বরং তা ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় জ্যোতিতে রূপান্তরিত হয়। একেই দেহতত্ত্বের ভাষায় ‘রতি থেকে মতি’ প্রাপ্তি বলা হয়।
**৩. মুর্শিদ:> এই দুর্গম পথের দিশারী লতিফা জাগ্রত করা এবং পঞ্চরসকে সংরক্ষণ করার এই পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল দূর্ভেদ্যও বটে্। তাই এখানে, মুর্শিদ বা গুরুর ভূমিকা অপরিহার্য:
* দৃষ্টির কিমিয়া:- মুর্শিদ সাধককে শেখান কীভাবে কামুক দৃষ্টির পরিবর্তে দয়ার নজরে জগৎকে দেখতে হয়।
* দমের নিয়ন্ত্রণ:- সঠিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে কীভাবে রতিকে ঊর্ধ্বে চালিত করতে হয়, তা গুরুর হাতে-কলমে শিক্ষা ছাড়া অসম্ভব।
* রাবেতা:- সাধক যখন বিচলিত হন, তখন মুর্শিদের আধ্যাত্মিক নেক নজর বা ফয়েজ তার ভেতরের পাশবিকতাকে ভস্ম করে নূরের শিখা প্রজ্বলিত রাখে।
এখানে সর্বপরি বলাবাহুল্য যে, সাধনার মাধ্যমে- নূর’ যখন মানব দেহে রূপান্তরিত হয়ে লতিফা গুলোকে জাগ্রত করে তোলে এবং ‘পঞ্চরস- তখন পরিশোধিত হয়ে মস্তিষ্কে জ্যোতি দেশে মিলিত হয়, তখন সাধক লাভ করেন ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণাঙ্গ মানবের মর্যাদা। তখন তার দেখা হয় স্রষ্টার দেখা, তার কাজ হয় স্রষ্টার ইচ্ছা। হাদিসে কুদসির সেই মহান বাণীর প্রতিফলন ঘটে তার (সাধকের) জীবনে-সে তখন মাটির মানুষ হয়েও নূরের আভায় জ্যোতিষ্ময় ভাস্বর হয়ে ওঠে।
এই সাধনা পূর্ণ করতে হলে দেহের ভেতরের ‘আদম’ ও ‘হাওয়া’-র (পুরুষ ও নারী শক্তি) ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করতে হয় এবং পঞ্চরস সংরক্ষণে খাদ্যতালিকায় (Dietary Discipline) কী ধরনের আমূল পরিবর্তন আনা জরুরী- এই বিষয়টি নিয়ে পর্ব-৪, এ বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ- আমিন> চলমান পাতা।














