চিরস্থায়ী লাভজনক ব্যবসা
মদীনার তপ্ত দুপুরে এক ইয়াতীম ছেলে তার বাগানের সীমানায় প্রাচীর তুলছিল। কিন্তু কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াল প্রতিবেশীর একটি খেজুর গাছ। ছেলেটি প্রতিবেশী আবু লুবাবার কাছে গিয়ে অনুরোধ করল গাছটি বিক্রি করতে, যাতে সে তার প্রাচীরটি সোজা করতে পারে। কিন্তু আবু লুবাবা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না।
উপায় না দেখে ছেলেটি আল্লাহর রাসূল -এর দরবারে হাজির হলো। নবীজি সব শুনে আবু লুবাবাকে ডেকে পাঠালেন। নবীজি তাকে অনুরোধ করলেন গাছটি ইয়াতীমকে দিয়ে দিতে, এমনকি এর বিনিময়ে জান্নাতে একটি খেজুর গাছের নিশ্চয়তা দিলেন। কিন্তু হায়! দুনিয়ার মোহে অন্ধ আবু লুবাবা জান্নাতের সেই শ্রেষ্ঠ প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিলেন।
এক অসম অবিশ্বাস্য প্রস্তাব
মসজিদে নববীতে তখন নীরবতা নেমে এসেছে। উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবু দাহদাহ (রা.) সব শুনছিলেন। তিনি জানতেন জান্নাতের একটি গাছের মূল্য কত! তিনি রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি ওই গাছটি কিনে ইয়াতীমকে দিয়ে দেই, তবে কি আমার জন্যও জান্নাতে একটি গাছ বরাদ্দ হবে?”
নবীজি বললেন, “হ্যাঁ।”
আবু দাহদাহ (রা.) কালক্ষেপণ না করে আবু লুবাবাকে বললেন, “আপনি কি আমার সেই বিখ্যাত বাগানটি চেনেন, যেখানে ৬০০ খেজুর গাছ, একটি বিশাল বাড়ি আর একটি মিষ্ট জলের কুয়া আছে?” আবু লুবাবা বললেন, “হ্যাঁ, মদীনায় কে না চেনে সেই বাগান!”
আবু দাহদাহ (রা.) ঘোষণা করলেন:
“আমি জান্নাতের সেই একটি গাছের বিনিময়ে আমার পুরো বাগানটি আপনাকে দিয়ে দিলাম। আপনি গাছটি আমাকে দিন।”
আবু লুবাবা তো অবাক! একটি সাধারণ গাছের বিনিময়ে মদীনার সেরা বাগান! সে দ্রুত রাজি হয়ে গেল। আবু দাহদাহ (রা.) তখনই সেই একটি গাছ ইয়াতীম ছেলেটিকে উপহার দিয়ে দিলেন।
রাসূলুল্লাহ -এর খুশির জোয়ার
এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে নবীজি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি বারবার বলতে লাগলেন:
“আবু দাহদাহর জন্য জান্নাতে এখন কত শত বিশাল বিশাল খেজুরের ঝোপ বা বাগান অপেক্ষা করছে!”
তিনি এতবার এই কথাটি বললেন যে উপস্থিত সাহাবীরা বুঝতে পারলেন—আবু দাহদাহ (রা.) দুনিয়া দিয়ে আসলে আস্ত জান্নাত কিনে ফেলেছেন।
উম্মে দাহদাহর অনন্য ঈমান
বাগানটি বিক্রি করে আবু দাহদাহ (রা.) তাঁর সেই পুরনো বাগানের দরজায় ফিরে গেলেন। ভেতরে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা ছিল। তিনি ভেতরে প্রবেশ না করে বাইরে থেকেই স্ত্রীকে ডাক দিলেন, “হে উম্মে দাহদাহ! বাচ্চাদের নিয়ে বাগান থেকে বেরিয়ে আসো। আমি এই বাগান বিক্রি করে দিয়েছি।”
স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কার কাছে বিক্রি করেছেন? কে আপনাকে কত দাম দিয়েছে?”
আবু দাহদাহ (রা.) শান্ত স্বরে বললেন, “আমি জান্নাতে একটি খেজুর বাগানের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দিয়েছি।”
একজন সাধারণ নারী হলে হয়তো হাহাকার করে উঠতেন, কিন্তু উম্মে দাহদাহ ছিলেন ঈমানের আলোয় আলোকিত। তিনি খুশিতে বলে উঠলেন:
“আল্লাহু আকবার! হে আবু দাহদাহ! আপনি অবশ্যই অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা করেছেন।”
এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে তিনি সন্তানদের হাত থেকে খেজুরগুলো কেড়ে নিলেন (যেহেতু তা এখন অন্যের সম্পদ) এবং হাসিমুখে জান্নাতের ঠিকানায় যাত্রা করার জন্য দুনিয়ার বিলাসী বাগান ত্যাগ করলেন।
শিক্ষা:
১. তাওয়াক্কুল: মুমিন জানে দুনিয়ার স্থাবর সম্পদ অস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর কাছে গচ্ছিত সম্পদ চিরস্থায়ী। ২. আদর্শ পরিবার: একজন নেককার স্ত্রী স্বামীর নেক কাজে বাধা না দিয়ে বরং উৎসাহ জোগান। ৩. জান্নাতের লোভ: দুনিয়ার সবচেয়ে দামী জিনিসের চেয়ে জান্নাতের একটি গাছের মূল্য অনেক বেশি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে আবু দাহদাহ (রা.)-এর মতো সাহসী এবং লাভজনক ব্যবসা করার তৌফিক দিন। আমীন।
[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১২৫০৪; ইবনে হীব্বান, হাদীস ৭১৫৯; আস-সিলসিলা সাহীহাহ, হাদীস ২৯৬৪; মুস্তাদরাকে হাকীম, হাদীস ২১৯৪]

















