শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২

ভোজ্যতেলের সংকট, দামও চড়া

ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১০ এএম | 56 বার পড়া হয়েছে
ভোজ্যতেলের সংকট, দামও চড়া

ঈদের পরও কমেনি বাজারের চাপ। সোনালি মুরগির দাম কয়েক দফা বেড়ে এখনো চড়া, ডিমেও ঊর্ধ্বগতি। ব্রয়লার কিছুটা কমলেও পয়লা বৈশাখ ঘিরে ইলিশের সংকট ও উচ্চ দামে স্বস্তি নেই ভোক্তাদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খুচরা পর্যায়ে এক কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৪১০-৪২০ টাকা দরে। সপ্তাহখানেক আগে যা ছিল ৪০০ টাকার মধ্যে। গত এক মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়েছে।

এ ছাড়া বাজারে স্বাভাবিক হয়নি ভোজ্যতেলের সরবরাহ। বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বোতলজাত তেলের সংকট কাটেনি। বিক্রেতারা বলছেন, ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলো মাঝে মাঝে তেলের সরবরাহ দিচ্ছে। সেটাও চাহিদার তুলনায় ৫-১০ শতাংশ।

ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট দূর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর আগে বুধবার ক্যাব মানববন্ধন কর্মসূচিতে এই খাতে সিন্ডিকেট হচ্ছে বলে দাবি করেছে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচা, মানিকনগর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা যায়, তেলের সরবরাহ না থাকায় অনেক দিন ভোজ্যতেলের ডিলার প্রতিনিধিরা ক্রয়াদেশ নিতে বাজারে আসেননি। তবে দু-এক দিন ধরে কোনো কোনো ব্র্যান্ড কোম্পানির প্রতিনিধিরা আসা শুরু করেছেন। কিন্তু তেলের সরবরাহ দিচ্ছেন কম। রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাজারের মুদিদোকানি সিফাত বলেন, ‘দৈনিক ১০-১৫ কার্টন তেল প্রয়োজন আমাদের। সেখানে অনেক দিন পর দুই কার্টন তেল দিয়েছে। সেটাও দুই লিটারের। এক ও পাঁচ লিটারের বোতল নেই।’

পাশে দাঁড়ানো রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের ডিলার প্রতিনিধি সোহাগ বলেন, ‘অনেক দিন আমরা তেল পাইনি। এখন কিছু কিছু পাচ্ছি। তবে সেটা অনেক কম। সব দোকানদার চাহিদা দিয়ে রেখেছে তাই ভাগ করে সবাইকে কিছু কিছু দিতে হচ্ছে। তবে দাম আগের মতোই রয়েছে।’

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, খোলা পাম তেলের খুব একটা সংকট নেই। তবে দাম কিছুটা বেশি। খোলা সয়াবিন তেলও রয়েছে। তবে সেটার সরবরাহে কিছুটা টান আছে। এতে দামও কিছুটা বেশি। বাজারগুলোতে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২২০ টাকা।

জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে একধরনের চাপ তৈরি করেছেন। তাঁরা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারের কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দিলেও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে খোলা তেল।

অন্যান্য মুদি পণ্যের মধ্যে চিনির দামও কিছুটা বেড়েছে। কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে চিনি বিক্রি হচ্ছে ১০৫-১১০ টাকা কেজি; যা গত সপ্তাহে ছিল ১০০-১০৫ টাকা। মসুর ডাল ও আটা-ময়দার দাম স্থির রয়েছে। মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, আটা ৪০-৪৫ টাকা ও ময়দা ৪৮-৬০ টাকা কেজি।

তেলের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও কমতে শুরু করেছে ব্রয়লার মুরগির দাম। সাম্প্রতিক সময়ে ২২০ টাকায় উঠে যাওয়া ব্রয়লার মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে।

খামারিরা বলছেন, খামারে খামারে বার্ড ফ্লুসহ নানা রোগে ব্যাপক হারে মুরগি মরে যাচ্ছে। যে কারণে সোনালি জাতের মুরগির সরবরাহ কমে গেছে এবং দামও বেড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে কিছু বেড়েছে ডিমের দাম। ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন ডিম ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১১০ টাকার মধ্যে।

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে ইলিশের চাহিদা বাড়ছে। তবে ৭ এপ্রিল থেকে দেশের বেশ কিছু ইলিশের অভয়ারণ্যে মাছ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে, যা ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। এতে বাজার প্রায় ইলিশশূন্য হয়ে পড়েছে। কিছু কিছু মাছ আসছে, যা সাগরের বলে বিক্রি হচ্ছে। তবে পরিমাণে খুবই কম। গতকাল মুগদা ও খিলগাঁও বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র একজন করে বিক্রেতার কাছে ইলিশ রয়েছে। ৪০০-৫০০ গ্রাম ওজনের সেই ইলিশের দাম চাইলেন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি। শান্তিনগর গিয়ে কিছুটা বড় ইলিশ পাওয়া গেলেও দাম চাইলেন ২ হাজার ৯০০ টাকা কেজি।

১০০ কাউন্টার সিলগালা ফুটপাত পুনরুদ্ধার

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:২৫ এএম
১০০ কাউন্টার সিলগালা ফুটপাত পুনরুদ্ধার

রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও গুলিস্তান এলাকায় দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে অবৈধ বাস কাউন্টার সিলগালা, ফুটপাত দখলমুক্ত এবং অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।

গতকাল দুপুরে সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এলাকায় টানা দ্বিতীয় দিনের অভিযানে প্রায় ৫০টি অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদ ও সিলগালা করা হয়। আগের দিনের অভিযানে বন্ধ করা হয়েছিল ১৮টি কাউন্টার। সব মিলিয়ে একশর মতো অবৈধ বাস কাউন্টারে তালা ঝুলিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএসসিসি। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত পরিচালিত এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু আসলাম।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মার্চ নগর ভবনে ডিএসসিসি, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সিদ্ধান্ত ছিল—টার্মিনালের বাইরে সব অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদ করে ভেতরে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে কাউন্টার বরাদ্দ দেওয়ার।

অভিযানে স্টারলাইন, শ্যামলী, সাকুরা, লাবিবা, ইউনিক লাক্সারিসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার বন্ধ করা হয়।

ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ কাউন্টারের কারণে এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছিল এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছিল। জনস্বার্থে এই অভিযান চলমান থাকবে।

একই দিন দুপুরে বায়তুল মোকাররম মার্কেটের দক্ষিণ পাশে জিপিও লিংক রোড এলাকায় পৃথক অভিযানে রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলা এ অভিযানে অবৈধ দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, অভিযানের খবর পেয়ে অনেক হকার আগেই মালামাল সরিয়ে নিচ্ছিলেন। তবে যেসব অস্থায়ী স্থাপনা রয়ে যায়, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়।

উচ্ছেদ হওয়া হকারদের অভিযোগ, আগে কোনো সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ অভিযান চালানো হয়েছে। তারা পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ মানবিক নয়। এক হকার বলেন, ‘আগে থেকে জানালে আমরা প্রস্তুতি নিতে পারতাম। হঠাৎ এসে সব ভেঙে দেওয়া ঠিক হয়নি।’

বিকেলে ডিএসসিসি এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব মালিকানাধীন বা আওতাধীন বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট ও দোকানসমূহের সামনে বা ফুটপাতে বিভিন্ন প্রকার মালামাল রাখায় বা ফুটপাত দখল থাকার কারণে জনস্বার্থ বিঘ্নিত হচ্ছে। এমতাবস্থায়, নিজ উদ্যোগে মালামাল অপসারণ করে ফুটপাত দখলমুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হলো। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের বা দোকানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর সমাধানের জন্য হকারদের পুনর্বাসন, নির্ধারিত বাজারব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

লেবাননের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন নেতানিয়াহু

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৫ এএম
লেবাননের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন নেতানিয়াহু

লেবাননের সঙ্গে সরাসরি শান্তি আলোচনার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধমকেই নিতে হয়েছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এই তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রমতে, স্থানীয় সময় বুধবার (৮ এপ্রিল) ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপ হয়। সেই ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লেবাননে হামলার তীব্রতা কমিয়ে আনতে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে বৈরুতের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে বলেন। ট্রাম্পের এই বার্তার পরই নেতানিয়াহু তাঁর মন্ত্রিসভাকে আলোচনার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।

তবে ট্রাম্পের কথায় নেতানিয়াহু লেবাননে হামলার মাত্রা কমাতে সম্মত হয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। তিনি আরও বলেন, লেবাননের সঙ্গে আলোচনা চললেও সামরিক অভিযান বা ‘হামলা’ বন্ধ হবে না। অর্থাৎ ইসরায়েল ‘আগুনের মধ্যেই আলোচনা’ চালিয়ে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে।

যদিও বুধবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলিরা লেবাননে হামলা সীমিত রাখার কথা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আজ বৃহস্পতিবারও ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং দক্ষিণ বৈরুতের বেশ কিছু এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার নতুন নির্দেশ জারি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লেবাননের সঙ্গে আসন্ন এই আলোচনায় ইসরায়েলের প্রতিনিধিত্ব করবেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার।

ধারণা করা হচ্ছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে লেবানন সীমান্তকেও শান্ত করার জন্য ট্রাম্পের এই সরাসরি হস্তক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

 

ইরানের শীর্ষ ৫২ জনই নিহত

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ২:১৪ এএম
ইরানের শীর্ষ ৫২ জনই নিহত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোতে নজিরবিহীন ধাক্কা লেগেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্তত ৫২ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কমান্ডার নিহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর ব্যাপ্তি ও গভীরতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইরানের সামরিক কমান্ড, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।

ক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত

এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। তাঁর মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব শূন্যতা সৃষ্টি করে। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা; তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সমন্বয় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাঁর মৃত্যুর পর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে উঠে আসেন আলী লারিজানি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।

একইভাবে প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব আলী শামখানি ছিলেন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম মুখ্য ব্যক্তি। পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত এক বৈঠকে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। এটি ইঙ্গিত দেয়—ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগুলোও শত্রুপক্ষের নজরদারির বাইরে ছিল না।

সামরিক নেতৃত্বে ধারাবাহিক ক্ষতি

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরিকে যুদ্ধের প্রথম মুহূর্তেই হত্যা করা হয়। তাঁর দায়িত্ব ছিল আইআরজিসি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করা। তাঁর মৃত্যু কার্যত সামরিক কমান্ড কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

পরবর্তীতে এই দায়িত্ব নেওয়া আব্দোলরাহিম মুসাভিও শিগগিরই একইভাবে নিহত হন। ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙে পড়ে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

কমান্ড কাঠামোর আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের কমান্ডার গোলামালি রশিদ। যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল। তিনিও যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হন, যা ইরানের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।

আইআরজিসি ও আঞ্চলিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত

ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার হোসেইন সালামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ পাকপোর। কিন্তু তিনিও খুব দ্রুত একই পরিণতির শিকার হন।

এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড আইআরজিসির তিনটি প্রধান শাখা—স্থল, নৌ ও মহাকাশ—সব কটিকেই আঘাত করে। মহাকাশ বাহিনীর প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ নিহত হওয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি বড় ধাক্কা খায়।

নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরির মৃত্যু পারস্য উপসাগরে ইরানের উপস্থিতিকে দুর্বল করে। ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে।

গোয়েন্দা কাঠামোয় ভাঙন

ইরানের গোয়েন্দা ব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হন, যার আগে তাঁর একাধিক শীর্ষ সহকারীও মারা যান।

আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ কাজেমিকে একটি বিভ্রান্তিমূলক অপারেশনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে দায়িত্ব নেওয়া মজিদ খাদেমিও নিহত হন।

এতে বোঝা যায়, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ গোয়েন্দা প্রধানও নিহত হওয়ায় গোটা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে।

পারমাণবিক কর্মসূচি লক্ষ্যবস্তু

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। মোহসেন ফাখরিজাদেহর হত্যাকাণ্ড ছিল এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরবর্তীতে এসপিএনডি সংস্থার প্রধান ও সাবেক প্রধান—উভয়কেই একই বৈঠকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। এতে বোঝা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি থামিয়ে দিতে সুপরিকল্পিতভাবে এর নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কুদস ফোর্স ও আঞ্চলিক প্রভাব

ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। ২০২০ সালে তাঁর হত্যার মধ্য দিয়ে এই নেটওয়ার্কে বড় ফাটল ধরে।

এরপর সিরিয়া, লেবানন ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন। যেমন—মোহাম্মদ রেজা জাহেদি এবং আব্বাস নিলফোরোশান। ফলে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অভ্যন্তরীণ দমননীতিতেও প্রভাব

বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি এবং তাঁর ডেপুটি নিহত হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চাপে পড়ে। এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিক্ষোভ দমন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।

কৌশলগত মূল্যায়ন

এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। যেমন—ইরানের অভ্যন্তরে গভীর গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক পর্যন্ত ট্র্যাক করতে সক্ষম। হামলাগুলো অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয়েছে, যা উন্নত প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক ক্ষতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামরিক সমন্বয়কে দুর্বল করেছে। কুদস ফোর্স ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।

ইরানের ৫২ জন শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডারের মৃত্যু শুধু একটি সামরিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ধারাবাহিক আঘাতের প্রতিচ্ছবি। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ইঙ্গিত দেয়, আধুনিক যুদ্ধ শুধু ময়দানে নয়—বরং গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা এবং অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা। তবে এই ধারাবাহিক ক্ষতির পর সেই পথ কতটা সহজ হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

error: Content is protected !!