এনামুল হক রাশেদী, চট্টগ্রামঃ
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি ফিরল শ্রমিকদের জীবনে
শ্রমিক নেতা জাহাঙ্গিরের ভূমিকাও প্রশংসনীয়। যন্ত্রপাতি বিক্রি করে বকেয়া পরিশোধ, ঈদের আগে হাসি ফিরল শতাধিক পরিবারের মুখে।
চট্টগ্রামে আবারও মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। ঈদের প্রাক্কালে বেতন-ভাতা বঞ্চিত শতাধিক শ্রমিকের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে তাঁর সময়োপযোগী ও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রশংসায় ভাসছে সর্বত্র।
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় অবস্থিত একটি পোশাক কারখানার প্রায় ১৩০ জন শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছিল। ঈদ সামনে—কিন্তু ঘরে নেই স্বস্তি, নেই ন্যূনতম নিশ্চয়তা। ঠিক এমন সময় জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ যেন আশার আলো হয়ে আসে।
জানা যায়, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জে.পি. সনেট লিমিটেড নামের কারখানাটির মালিকপক্ষকে কঠোরভাবে বকেয়া পরিশোধে বাধ্য করা হয়। অবশেষে গত বুধবার (১৮ মার্চ) কারখানার যন্ত্রপাতি বিক্রি করে প্রায় ১৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয় এবং প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সেই অর্থ শ্রমিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
শ্রমিকদের একজন, সিনিয়র অপারেটর মো. মনির হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“ডিসি স্যার নিজে বিষয়টি তদারকি করেছেন। তিনি না থাকলে আমরা হয়তো আমাদের পাওনা পেতাম না। ঈদের আগে এই টাকা পেয়ে আমরা বাঁচলাম।”
‘বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন’-এর বায়েজিদ থানার সভাপতি শ্রমিক নেতা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শ্রমিক অসন্তোষের খবর পেয়ে থানায় গিয়ে পুলিশ পাঠানোর অনুরোধ করি। জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করি। ডিসি স্যার হস্তক্ষেপ না করলে ঈদের আগে শ্রমিকরা তাদের পাওনা পেতেন না। পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারত এবং শ্রমিকদের দুর্ভোগ বাড়ত।
এদিকে কারখানার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি জানান, নানা চেষ্টা করেও অর্থের ব্যবস্থা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত যন্ত্রপাতি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সমঝোতার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস জানান, শুরুতে কিছু জটিলতা থাকলেও জেলা প্রশাসকের কঠোর অবস্থানের কারণে ক্রেতা ও মালিকপক্ষ দ্রুত সমাধানে আসতে বাধ্য হয়। রাতভর প্রচেষ্টার পর ভোরেই শ্রমিকদের হাতে পুরো টাকা তুলে দেওয়া সম্ভব হয়।
চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান বলেন, “আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও জেলা প্রশাসকের সক্রিয় ভূমিকায় শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করা গেছে—যা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “শ্রমিকদের দুর্দশার কথা বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এ ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে, যাতে ঈদের আগে তারা তাদের প্রাপ্য পায়।”
উল্লেখ্য, গত ১৪ মার্চ শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৬ মার্চ প্রশাসন, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বকেয়া পরিশোধের অঙ্গীকার করা হলেও তা বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপে চার দিনের আন্দোলনের অবসান ঘটে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো—সমন্বিত উদ্যোগ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্বশীল প্রশাসনিক নেতৃত্ব থাকলে জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান সম্ভব। ঈদের আগে শ্রমিকদের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে জেলা প্রশাসন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়।








