মামুনুর রশীদ মামুনঃ
সংবাদ সংগ্রহে বাধা ও হামলা: কবে আসবে কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন?
গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ”। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ রক্ষায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর সেই সংবাদমাধ্যমের মূল চালিকাশক্তি হলেন সাংবাদিকরা। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চিত্র হলো—যারা সমাজের অন্যায়,দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে সত্য তুলে ধরেন,অনেক সময় তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েন। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হামলা,হুমকি,মামলা কিংবা নানামুখী হয়রানির ঘটনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর,ক্যামেরা বা সরঞ্জাম ভাঙচুর,এমনকি জীবননাশের হুমকির মতো ঘটনা মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বা অনিয়মের খবর প্রকাশের পর অনেক সাংবাদিককে চরম চাপের মুখে পড়তে হয়। কখনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল,কখনো অপরাধী চক্র কিংবা কখনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয় তাদের। এই বাস্তবতায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করেন,তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? সংবিধান নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বাধীনতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে নানা বাধা ও ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ করেন। মাঠে কাজ করার সময় তারা প্রায়ই স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর চাপে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে হামলা বা ভয়ভীতির ঘটনা ঘটলেও যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয় না।
এই পরিস্থিতি শুধু একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি মূলত গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রশ্ন। কারণ সাংবাদিক যদি নিরাপদ না হন,তবে স্বাধীনভাবে সত্য তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। আর সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হলে সমাজে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়। তখন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বের অনেক দেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন রয়েছে। এসব আইনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা,সংবাদ সংগ্রহে বাধা প্রদান কিংবা পেশাগত কাজে হস্তক্ষেপকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে আইনি কাঠামো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি উঠছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনো একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। একটি কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যেমন—সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকের কাজে বাধা প্রদানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা,সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হুমকির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অপব্যবহার প্রতিরোধে আইনি সুরক্ষা দেওয়া। এছাড়া সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিক হুমকি বা হামলার শিকার হলে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার—সাংবাদিক সুরক্ষা আইন মানে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করা নয়। বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও পেশাগত নৈতিকতা,তথ্যের নির্ভুলতা এবং দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে।
কারণ একটি শক্তিশালী গণমাধ্যমের জন্য যেমন স্বাধীনতা প্রয়োজন,তেমনি প্রয়োজন পেশাগত দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে আরও টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আর সেই প্রক্রিয়ায় স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা একটি অপরিহার্য উপাদান। সুতরাং এখন সময় এসেছে বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সময়োপযোগী ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন আজ শুধু একটি পেশাগত দাবি নয়; এটি গণতন্ত্রের স্বার্থেই প্রয়োজন। কারণ সত্যের পথ যত নিরাপদ হবে,রাষ্ট্র ও সমাজ ততই শক্তিশালী হবে।

















