রাজা লক্ষ্মণসেন: বীর যোদ্ধা না ইতিহাসে অবহেলিত রাজা?
১১৭৯ অব্দে লক্ষ্মণসেন পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকাল সম্পর্কে আমরা যে বিস্তৃত ধারণা পাই, তার প্রধান উৎস আটখানি তাম্রশাসন, সভাকবিদের রচিত প্রশস্তিমূলক শ্লোক, তাঁর পুত্রদের তাম্রশাসন এবং মুসলমান ঐতিহাসিক মিনহাজ-উদ্-দীন রচিত তবকাত-ই-নাসিরি। এই সকল সূত্র একত্রে বিচার করলে লক্ষ্মণসেনকে কেবল সেনবংশের শেষ শক্তিশালী শাসক হিসেবেই নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার অন্যতম সফল সামরিক সম্রাট হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়।
শৈশবকাল থেকেই লক্ষ্মণসেন যুদ্ধক্ষেত্রে অভ্যস্ত ছিলেন। পিতা বিজয়সেন ও পিতামহ বল্লালসেনের সঙ্গে তিনি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং অল্প বয়সেই নিজের রণকুশলতার পরিচয় দেন। তাঁর তাম্রশাসন থেকে জানা যায়—কৈশোরে তিনি উদ্ধত গৌড়েশ্বরের শ্রীহরণ করেন, যৌবনে কলিঙ্গে অভিযান চালান, কাশির রাজাকে পরাজিত করেন এবং প্রাগজ্যোতিষের (কামরূপ) রাজাকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। যদিও এই সব অভিযানের কিছু অংশ পিতা বা পিতামহের রাজত্বকালেই শুরু হয়েছিল, তথাপি গৌড় জয় যে সম্পূর্ণভাবে লক্ষ্মণসেনের হাতেই সম্পন্ন হয়েছিল, তা বহু ঐতিহাসিক প্রমাণে স্পষ্ট।
গৌড়ের রাজধানী ‘লক্ষ্মণাবতী’ নামটি যে তাঁর নামানুসারেই রাখা, এবং সেনরাজাদের মধ্যে তিনিই প্রথম ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধি গ্রহণ করেন—এগুলি নিছক কাকতাল নয়। কলিঙ্গ ও কামরূপ জয়ও সম্ভবত পূর্বতন রাজাদের আমলে শুরু হলেও, পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করতে লক্ষ্মণসেনকে পুনরায় যুদ্ধ করতে হয়। তাঁর পুত্রদের তাম্রশাসনে উল্লেখিত সমুদ্রতীরে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র (পুরী), কাশী ও প্রয়াগে ‘সমরজয়স্তম্ভ’ স্থাপন এই দীর্ঘ ও সফল সামরিক অভিযানেরই প্রমাণ।
পশ্চিম দিকে গাহড়বাল রাজাদের সঙ্গে লক্ষ্মণসেনের সংঘর্ষ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গাহড়বাল রাজারা মগধে দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করছিলেন, যা সেনরাজ্যের পক্ষে গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যদিও যুদ্ধের বিশদ বিবরণ আমাদের কাছে নেই, তবু বোধগয়া ও গয়া জেলার লিপি থেকে প্রমাণ মেলে যে লক্ষ্মণসেন মগধের বিস্তীর্ণ অংশে রাজ্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গাহড়বাল রাজা জয়চন্দ্রকে পরাজিত না করে গয়া অধিকার করা অসম্ভব—এই ঐতিহাসিক সত্য লক্ষ্মণসেনের সামরিক সাফল্যকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
উত্তরে গৌড়, পূর্বে কামরূপ, দক্ষিণে কলিঙ্গ এবং পশ্চিমে মগধ—চার দিকেই সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে লক্ষ্মণসেন পৈতৃক রাজ্যকে শুধু রক্ষা করেননি, বরং আরও বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরেও মগধে রাজ্য গণনার ক্ষেত্রে ‘লক্ষ্মণসেনাব্দ’ ব্যবহৃত হওয়া তাঁর ক্ষমতার গভীর প্রভাবেরই পরিচায়ক।
তবে লক্ষ্মণসেন কেবল যুদ্ধবাজ রাজাই ছিলেন না। পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ অদ্ভুতসাগর তিনি নিজ হাতে সম্পূর্ণ করেন। তিনি নিজেও একজন কবি ছিলেন এবং তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন ধোয়ী, জয়দেব, গোবর্ধন, শরণ ও উমাপতিধরের মতো মহাকবি ও পণ্ডিতেরা। প্রধানমন্ত্রী হলায়ুধ ছিলেন ভারতখ্যাত বিদ্বান। জয়দেবের বৈষ্ণব পদাবলী আজও ভারতীয় সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও লক্ষ্মণসেন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেন। পিতা ও পিতামহ যেখানে ‘পরম-মাহেশ্বর’ উপাধি ধারণ করতেন, সেখানে লক্ষ্মণসেন গ্রহণ করেন ‘পরমবৈষ্ণব’ উপাধি। তাঁর তাম্রশাসনগুলি নারায়ণের বন্দনায় শুরু হয়। এতে স্পষ্ট যে তিনি শৈব ঐতিহ্য বজায় রেখেও বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।
প্রায় ষাট বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করে প্রায় কুড়ি বছর রাজত্ব করার পর, আশি ছুঁইছুঁই বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেন নবদ্বীপে গমন করেন। এই সময়েই রাজ্যে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং একই সঙ্গে উত্তর ভারতে তুর্কি আক্রমণের ভয়াবহ ছায়া নেমে আসে। দুর্ভাগ্যবশত, এই সংকটময় সময়ের দেশীয় কোনো সমকালীন বিবরণ আমাদের হাতে নেই। অনেক পরে তুর্কি ঐতিহাসিকদের মুখে শোনা কাহিনির উপর নির্ভর করেই ইতিহাস লেখা হয়েছে।
এর ফলেই ‘১৭ জন তুর্কি অশ্বারোহী বঙ্গদেশ জয় করেছিল’—এই অবাস্তব ও হাস্যকর গল্প প্রচলিত হয়েছে, আর সেই গল্পের ভিত্তিতেই লক্ষ্মণসেনকে কাপুরুষ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে যিনি সারাজীবন যুদ্ধ করে সাম্রাজ্য গড়েছেন, তাঁকে এইভাবে অবমূল্যায়ন করা ঐতিহাসিক অন্যায় ছাড়া কিছু নয়। তাই লক্ষ্মণসেনকে বুঝতে হলে কিংবদন্তি নয়, প্রমাণভিত্তিক ইতিহাসের আলোতেই তাঁকে পুনরায় বিচার করা একান্ত প্রয়োজন।

















