লজ্জা
রিমান্ডে গত তিনদিন ধরে এক শাড়ি পরে আছি ! ড্রাইভার রফিক ভাই তিনদিন ধরে একটা পেটমোটা ব্যাগ নিয়ে ডিবি অফিসের বাইরে ঘুরঘুর করছে! তাকে দেখা করার অনুমতি দেয়া হচ্ছেনা !
জুলাই মাসের চাঁদি ফাটা গরম! চার দিনের দিন সিল্কের ব্লাউজ শরীর কেটে মাংসের মধ্যে গেঁথে গেছে! পরনের মসলিন শাড়িটা কোমরে যেখানে পেটিকোটে গোঁজা -সেখানে ঘা হয়ে গেছে ! পাঁচ দিনের দিন আতংকে, দুশ্চিন্তায় পিরিয়ড হয়ে গেল! রক্তাক্ত ঘর্মাক্ত শরীর! ভাগ্যিস শাড়ির রং লাল ছিল – লাল রং সব কিছু লুকাতে জানে- ঘামের দাগ, রক্তের দাগ, কষ্টের দাগ, অপমানের দাগ!!
কারাগারে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী তল্লাশি পর্ব ! একে একে নতুন আগত বন্দিনীকে কারাবিধান অনুযায়ী চেক করা হচ্ছে! ভয়ে শিউরে উঠলাম ! কেউ কোনরকম নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ে এসেছে কি না সেকারণেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা! এত অপমানজনক আর ভয়াবহ তল্লাসি বিশ্বজগতে একমাত্র কারাগারগুলোতেই প্রচলিত!
আমার পালা আসলো! মহিলা রক্ষী মৃদু কন্ঠে বললো, ব্রা খুলুন! অসম্ভব অবিশ্বাস্য বাক্য – আমি কি ঠিক শুনছি !? হতভম্ব হয়ে এক পা পিছিয়ে আসি- না না – কক্ষোনো না !!! কিছুতেই না!!!
ডেপুটি জেলার খুব মিষ্টি চেহারার মেয়ে! বিসিএস – নন ক্যাডার! এসে শান্ত স্বরে বললেন, আপা, আপনি ত জানেন-Rule is rule! আমাদের duty করতে দিন ! চরম গ্লানিকর সেই মুহূর্তটা মনে করলে এখনও রাতে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসি! সারারাত আর ঘুম আসেনা!
কারাগারে আসার পর আব্বাজান একটি কাপড়ের ব্যাগ পাঠালেন! খুলে চক্ষু চড়কগাছ! আমার জামদানি, মসলিন, জারদৌসি কাজ করা শিফন – যা তার চোখে সুন্দর লেগেছে পাঠিয়েছেন – ! রাগে দু:খে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করলো ! পরে ভাবলাম, চৌদ্দ গুষ্টিতে কোন মেয়ে তো দূর -কোন ছেলেও তো জেলে যায়নি! আব্বাজান কেমনে জানবে, কি ধরনের কাপড় জেলে পরতে হয় !
আমিও তো কখনও ভাবিনি জেলে যেতে হবে – তাই জেলখানা উপযোগী শাড়ি কিনে তো আলমারিতে রেখে আসিনি! আব্বা’র কি দোষ!?
একটা কালামকারি আর একটা মাদুরাই শাড়ি রেখে বাকী সব ফেরত পাঠিয়েছি! এমন অনেকদিন হয়েছে গোসল করে ভেজা শাড়ি শরীরেই শুকিয়েছি !
নারী কারাগারে এক হাজার বন্দিনীর জন্য মাত্র দুটো চৌবাচচা ! একটা হাজতিদের জন্য- একটা কয়েদীদের জন্য ! খোলা আসমানের নিচে, সস্তা সাবান গায়ে ডলে সবাই গোসল করে, ভেজা কাপড় বদলায়-যুবতী ,বৃদ্ধা -আড়াল নেই, পর্দা নেই! করমের দোষে শরম গেছে! লজ্জা পেলে ন্যাকা বলবে !
পয়তাল্লিশ জন একই টয়লেট ব্যব্যবহার করে! সেটার দরজা অর্ধেক কাটা! এটাই নিয়ম ! কোন বন্দিনী একটু বেশিক্ষণ টয়লেটে থাকলে রুমের পাহারা নি:সংকোচে নির্বিকার মুখে উঁকি দিয়ে দেখে কিজন্য অধিক সময় লাগছে !
টয়লেটে যত লজ্জাজনক অবস্থায় বন্দি মানুষটি থাকুক না কেন – পাহারার এতে ভ্রুক্ষেপ নেই ! শালীনতার মতো ভারিক্কী শব্দের গুরুভার জেলখানার জরাজীর্ণ টয়লেট বহন করতে পারেনা!
তিনটি বছর প্রতি মুহূর্তে চোখের জলে আমি লজ্জা গুলে খেয়েছি ! যারা তখন লজ্জা নিবারণ করতে আসেন নি তারা এখন শালীনতার বাণী শুনিয়ে লজ্জা দিতে আসবেন না !
লজ্জা পাব !














