দেববংশ, দামোদরদেব ও দনুজমাধবের বিস্মৃত ইতিহাস
সেনবংশের শেষ স্বাধীন রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের অন্তিম পর্বে যখন গৌড় রাজ্য মুসলমান আক্রমণের চাপে ভেঙে পড়ছে, তখন বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিস্মৃত অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই সময়েই মেঘনার পূর্বতীরে এক স্বাধীন হিন্দু রাজশক্তির উত্থান ঘটে, যাকে আমরা ইতিহাসে দেববংশ নামে চিনি। সাধারণভাবে মনে করা হয় সেনদের পতনের পর বাংলা সম্পূর্ণভাবে মুসলমান শাসনের অধীনে চলে গিয়েছিল, কিন্তু দেববংশীয় রাজাদের উত্থান সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এই দেববংশের প্রথম পরিচিত পুরুষ হলেন পুরুষোত্তম। তাঁকে তাম্রশাসনে ‘দেবান্বয়-গ্রামণী’, অর্থাৎ দেববংশের প্রধান বলা হয়েছে, কিন্তু কোথাও তাঁকে রাজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এর থেকেই অনুমান করা যায়, তিনি হয়তো ছিলেন বংশনেতা বা সামন্তশক্তির প্রধান, পূর্ণ সার্বভৌম শাসক নন। তাঁর পুত্র মধুমথনদেবের নামেই প্রথম এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠার কথা জানা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয়, মধুমথনদেব ও তাঁর পুত্র বাসুদেব—এই দুই প্রজন্ম সম্পর্কে ইতিহাস প্রায় সম্পূর্ণ নীরব। তাঁদের শাসনকাল, যুদ্ধ কিংবা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
দেববংশের ইতিহাসে প্রথম স্পষ্ট আলো পড়ে বাসুদেবের পুত্র দামোদরদেবের সময়ে। তাঁর নামে প্রাপ্ত দুইখানি তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে তিনি ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং অন্তত ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এই তাম্রশাসনগুলির ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে তাঁর রাজ্য বর্তমান ত্রিপুরা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি নিজেকে ‘সকল ভূপাল-চক্রবর্ত্তী’ ও ‘অরিরাজ-চাণুর-মাধব’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন, যা তাঁর সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় বহন করে। সম্ভবত সেনবংশীয় রাজা বিশ্বরূপসেনের মৃত্যুর পর উদ্ভূত রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে দামোদরদেব তাঁর পৈতৃক রাজ্যের সীমা আরও বিস্তার করতে সক্ষম হন।
দামোদরদেবের মৃত্যুর পর এই দেববংশীয় রাজ্যের ভবিষ্যৎ কী হয়েছিল, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঢাকা জেলার আদাবাড়ী থেকে প্রাপ্ত একখানি জীর্ণ তাম্রশাসন আমাদের সামনে আর এক শক্তিশালী দেববংশীয় শাসকের নাম উপস্থিত করে—দশরথদেব। এই তাম্রশাসনে তাঁর পূর্ণ উপাধি দেওয়া হয়েছে ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ অরিরাজ-দনুজমাধব দশরথদেব’। তিনি বিক্রমপুরকে রাজধানী করে শাসন করতেন এবং কেশবসেন ও বিশ্বরূপসেনের অনুকরণে অশ্বপতি, গজপতি, নরপতি ও রাজত্রয়াধিপতি উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। সেনরাজাদের পরিচিত ‘সেনকুল-কমল-বিকাস-ভাস্কর’ উপাধির পরিবর্তে তাঁর শাসনে ব্যবহৃত হয় ‘দেবাম্বয়-কমল-বিকাস-ভাস্কর’, যা তাঁকে দেববংশীয় শাসক হিসেবে নির্দেশ করে।
তাঁর তাম্রশাসনে উল্লেখ রয়েছে যে নারায়ণের কৃপায় তিনি গৌড় রাজ্য লাভ করেছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকদের বিবরণ অনুযায়ী এই সময়ে গৌড় তুর্কি শাসনের অধীন ছিল। কিন্তু বাস্তবে বাংলায় তুর্কি প্রভুত্ব সুদৃঢ় হতে বহু বছর সময় লেগেছিল। এই দীর্ঘ অস্থিরতার সময়ে হিন্দু রাজারা বারবার হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আংশিকভাবে সফলও হয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষিতে দশরথদেবের গৌড়ের কিছু অংশ অধিকার করা একেবারে অসম্ভব বা কল্পনাপ্রসূত বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই দশরথদেবকে অনেক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বার্ণীর বিবৃত ‘সোনারগাঁয়ের রাজা দনুজরায়’-এর সঙ্গে এক করে দেখেন। বার্ণীর মতে, দিল্লির সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবন যখন ১২৮৩ খ্রিস্টাব্দে তুঘরিল খানের বিদ্রোহ দমনে বঙ্গদেশে অভিযান করেন, তখন সোনারগাঁয়ের রাজা দনুজরায় তাঁর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হন।
সোনারগাঁ ও বিক্রমপুর—উভয় অঞ্চলই ধলেশ্বরী নদীতীরবর্তী হওয়ায় বিক্রমপুরের ‘অরিরাজ-দনুজমাধব’ বিদেশি ঐতিহাসিকদের চোখে ‘দনুজরায়’ নামে পরিচিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বাংলার কুলজী গ্রন্থেও কেশবসেনের কিছুদিন পর দনুজমাধব নামে এক রাজার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই সব সূত্র মিলিয়ে বিচার করলে অনুমান করা যায় যে দশরথদেব বলবনের অভিযানের সময়, অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজত্ব করছিলেন।
দেববংশের আর একটি শাখার পরিচয় পাওয়া যায় শ্রীহট্ট অঞ্চলে। শ্রীহট্টের নিকটবর্তী ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত দুইখানি তাম্রশাসন থেকে খরবাণ, গোকুলদেব, নারায়ণদেব, কেশবসেন, ঈশানদেব ও কেশবদেব—এই ধারাবাহিক রাজাদের নাম জানা যায়। এই বংশের কেশবদেব একজন বিখ্যাত যোদ্ধা ছিলেন এবং তিনি তুলাপুরুষ যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন। ঈশানদেব অন্তত সতেরো বছর রাজত্ব করেছিলেন। লিপির অক্ষরবিন্যাস বিচার করে অনুমান করা হয় যে এই রাজারা ত্রয়োদশ অথবা চতুর্দশ শতাব্দীতে শাসন করতেন। দেব উপাধির ভিত্তিতে তাঁদের দেববংশীয় বলে মনে করা হলেও, পূর্বোক্ত দেববংশের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না।
শ্রীহট্ট অঞ্চলের লোককথা ও “হট্টনাথের পাঁচালী” নামক পুঁথিতে উল্লেখ রয়েছে যে এই অঞ্চলের এক রাজা গৌরগোবিন্দ সুফি সাধক শাহজালালের হাতে পরাজিত হন, যার তারিখ ধরা হয় ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দ। কেশবদেবের একটি উপাধি ছিল ‘রিপুরাজ গোপী-গোবিন্দ’। এই কারণেই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, কিংবদন্তির গৌরগোবিন্দ ও এই কেশবদেব সম্ভবত একই ব্যক্তি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সেনরাজ্যের পতনের পর বাংলায় হিন্দু রাজশক্তি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। দেববংশীয় রাজারা নানা অঞ্চলে স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন, কখনো আঞ্চলিক সাফল্যও অর্জন করেছিলেন। খণ্ডিত তাম্রশাসন, বিদেশি ঐতিহাসিকদের বিবরণ ও লোককথার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এই ইতিহাস বাংলার মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। দেববংশের এই বিস্মৃত অধ্যায় তাই শুধু একটি রাজবংশের ইতিহাস নয়, বরং বাংলার শেষ স্বাধীনতার দীর্ঘ ও জটিল সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।














