ব্যঙ্গ থেকে বরণ
হুনায়নের যুদ্ধ শেষ করে নবী করীম ﷺ সাহাবীদের নিয়ে মদিনার পথে ফিরছেন। পথিমধ্যে নামাজের সময় হলে হযরত বেলাল (রা.) তাঁর সেই দরাজ কণ্ঠে আজান দিতে শুরু করলেন। সেই মরুপ্রান্তরের পাশেই ছিল কুরাইশ ও মুশরিকদের একটি বসতি। সেখানে ১০-১২ জন কিশোর ও যুবক জড়ো হয়েছিল।
বেলাল (রা.)-এর আজান শুনে তারা হাসি-ঠাট্টা শুরু করল। তাদের মধ্যে আবু মাহজুরা নামের এক কিশোর, যার কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুমধুর, সে আজানকে ব্যঙ্গ করে হুবহু নকল করতে লাগল। বিষয়টি অত্যন্ত অপমানজনক হলেও দয়ার নবী ﷺ সেই ব্যঙ্গাত্মক সুরের মাঝে এক অসাধারণ প্রতিভা খুঁজে পেলেন।
প্রতিভার সন্ধানে দয়ার নবী ﷺ
নবীজি ﷺ সাহাবীদের বললেন, “এই যুবকদের আমার সামনে নিয়ে এসো।” সাহাবীরা তাদের ধরে নিয়ে এলেন। তারা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নবীজির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। নবীজি ﷺ অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের মধ্যে কার কণ্ঠ এত সুন্দর? কে এখনই আজান দিচ্ছিল?”
আবু মাহজুরার বন্ধুরা ভয়ে সব তার ওপর চাপিয়ে দিল। আবু মাহজুরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো তার গর্দান যাবে। কিন্তু নবীজি ﷺ তাকে ধমক না দিয়ে বরং পরম মমতায় তার কাছে ডাকলেন।
শত্রু থেকে পরম বন্ধু
নবীজি ﷺ আবু মাহজুরার মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর বরকতময় হাতের ছোঁয়ায় আবু মাহজুরার ভেতরের সব ঘৃণা আর ভয় কর্পূরের মতো উড়ে গেল। নবীজি বললেন, “দাঁড়াও, আমি তোমাকে আজান শিখিয়ে দিই।”
নবীজি ﷺ একটি করে বাক্য পড়তে লাগলেন, আর আবু মাহজুরা তা পুনরাবৃত্তি করতে লাগল। আবু মাহজুরা বলেন:
“নবীজি যখন আমাকে আজান শেখাচ্ছিলেন, তখন প্রতিটি বাক্যের সাথে আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। আমার মনে হলো, এই পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই।”
আজান শেষ করেই আবু মাহজুরা নবীজি ﷺ-এর হাতে হাত রেখে কালেমা শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
মক্কার শ্রেষ্ঠ উপহার
নবীজি ﷺ তখন আবু মাহজুরার হাতে কিছু রূপা উপহার দিলেন এবং একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন:
“আবু মাহজুরা! আজ থেকে আমি তোমাকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মসজিদ, মক্কার ‘মসজিদুল হারাম’-এর মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দিলাম। তুমি সেখানে আজান দেবে।”
যেই কিশোর কিছুক্ষণ আগে আযানকে ব্যঙ্গ করছিল, নবীজির সামান্য মহানুভবতা আর দূরদর্শিতায় সে হয়ে গেল কাবার প্রধান মুয়াজ্জিন। আবু মাহজুরা (রা.) সারাজীবন সেই বরকতময় স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন।
গল্পের শিক্ষা:
১. নবীজির মহানুভবতা: অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করাই ছিল নবীজির আদর্শ। ২. প্রতিভার কদর: নবীজি ﷺ মানুষের ভেতরের গুণকে চিনতে পারতেন এবং তাকে ইসলামের সঠিক পথে কাজে লাগাতেন। ৩. বিদ্বেষ থেকে মুক্তি: ঘৃণা দিয়ে নয়, বরং উত্তম আচরণ দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করাই ইসলামের শিক্ষা।

















