এক কালজয়ী আড্ডার উপাখ্যান
বটতলার ঝংকার: নওগাঁর অলংকার
নওগাঁ বাজারের হৃৎপিণ্ডে, যেখানে চাটমোহর,ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া চারটি থানার সীমানা মিলেমিশে একাকার, সেখানে এক শতবর্ষী বটবৃক্ষ তার মহিমান্বিত শিখর ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে—যার নাম ঝংকার বটতলা।
১৩ নভেম্বর, সকালে মর্নিং ওয়াক সেরে আউয়াল মামার চায়ের আড্ডায় যখন মুন্নু, শিশির, বাবু, শিমুল, আলিম এবং আরিফ একসাথে বসেছিলেন, তখনই আব্দুল আলিম মাস্টার ছন্দে ছন্দে বলে উঠলেন: “বটতলার ঝংকার – নওগাঁর অলংকার।” এই কথাটিই যেন অতলান্ত স্মৃতিকে টেনে আনল, আর সেই ধারাবাহিকতায় লেখা হলো এই কালজয়ী আড্ডার উপাখ্যান।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তীর্থক্ষেত্র ও ‘নিলাঞ্জন নাট্যগোষ্ঠীর জয়’ ঝংকার বটতলা কেবল একটি স্থান নয়, এটি যেন নওগাঁর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের স্পন্দন, শিল্প, সাহিত্য আর উচ্চ চিন্তার এক অমর আড্ডাস্থল। ৯০-এর দশক এবং তারও আগের স্মৃতিতে, এই বটতলা ছিল ঝংকার নবীন সংঘের প্রাণকেন্দ্র। এই সংঘের সদস্যরা ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির নিরলস সাধক। ঝংকার ক্লাবের ঘরে বসেই এদতাঅঞ্চলের জাতীয় পর্যায়ের নাট্যকর্মীরা তাদের স্বপ্ন বুনতেন। নিলাঞ্জন নাট্যগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল—যারা সমাজ ও সময়ের নানা অনিয়মকে মঞ্চে তুলে ধরতেন—তাদের আস্তানা ছিল এই ঝংকার নবীন সংঘ। মিচমেথুইর, করতকান্দি, বৃরায়নগর, নওগাঁ তেলিপাড়ার হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক জোটের শিল্পীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই চত্বর। তাদের মঞ্চ নাটকগুলো তৎকালীন সমাজে শিক্ষা ও শিল্পকলার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
স্মরণ করা যাক সেই সময়ের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। একদা চারণ কবি মোনাজাত উদ্দিন এই পশ্চাদপদ চলনবিলের অমসৃণ মেঠো পথ পেরিয়ে অজপাড়া গাঁ মিচমেথুইর ও করতকান্দি গ্রামে এসেছিলেন। বৃন্দাবন দাস সহ অন্যান্য নাট্য ব্যক্তিত্বদের সাথে তিনি নিরঞ্জন নাট্যগোষ্ঠীর মঞ্চ নাটক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাদের সেই শিল্পকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ, পরবর্তীতে ঢাকার টিএসসি মুক্ত মঞ্চে এই শিল্পী গোষ্ঠী “এ সমাজ ভাঙলো যারা” নাটকটি মঞ্চস্থ করে সংস্কৃতি অঙ্গনে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। সেই সফল নাট্যযাত্রার শুরুটা হয়েছিল এই ঝংকার বটতলার নবীন সংঘ থেকেই।
এই গোষ্ঠীটির নেতৃত্বেই একসময় নওগাঁ বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দুটি ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল—’সোনালী সিনেমা হল’ এবং ‘সৈকত সিনেমা হল’।’
যাত্রাপালার মঞ্চ সমাজ বদলের মন্ত্র’ ঝংকার নবীন সংঘের পরিচালনায় এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা। এই যাত্রাপালাগুলো কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল সমাজকে বদলানোর এক শৈল্পিক প্রচেষ্টা। নবাব সিরাজদৌলা, লাইলি মজনুর প্রেম, শিরি ফরহাদ, সাগর ভাসা, বেদের মেয়ে জোসনার মতো অমর কাহিনিগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর আনন্দ ও চিন্তার খোরাক যোগাত। বর্তমানের আড্ডা, অতীতের স্মৃতি বর্তমানে এই ঝংকার বটতলা নওগাঁর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শতবর্ষী বটগাছটি আর তার সুবিশাল ছায়া যেন সকল সময়ের সাক্ষী। এর নিচে প্রতিদিনই বসে নানা পেশা, নানা চিন্তাধারার মানুষের চায়ের আড্ডা। শামসুলের কড়া চা আর সাহাদের সুগন্ধি খিলি পান—এই দুইয়ের মিশেলে আড্ডার মেজাজ আরোও জমে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত কবি, লেখক-সাহিত্যিকরা আজও এই বটতলা থেকে আপ্যায়ন গ্রহণ করেন।
তবে কালের বিবর্তনে, সেই সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব মানুষগুলি আজ বয়সের ভারে হাতে লাঠি, চোখে চশমা; কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছেন না-ফেরার দেশে। যেখানে একদিন শিল্প-সাহিত্যর গুঞ্জন ছিল, আজ সেখানে রাজনীতির হাওয়া। বর্তমান নেতারা এই আড্ডার জায়গাটিকেই নিজেদেরকে নেতা হিসেবে জাহির করার মঞ্চ করে তুলেছেন।
করতোয়ার শাখা নদীর তীরে ঘেঁষে অবস্থিত এই ঝংকার বটতলাটি, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া, নর্থ বেঙ্গল এবং এমনকি রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত যাওয়ার পথের প্রবেশদ্বার।
ঝংকার বটতলা তার অতীতের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ঝংকারকে তার ঐতিহ্য বহন করে; এটি বর্তমানের আড্ডা আর রাজনীতিকে ধারণ করে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক কালজয়ী সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।














