গোরস্থান
সালটা ২০১২। গ্রীষ্মের রাত, মে মাসের মাঝামাঝি। নওশের ভাই তখনও কলেজে পড়েন, তবে বয়সে বেশ পরিণত। সেবার গ্রামে আয়োজিত হয়েছিল শতবর্ষ পূর্তি কুস্তি প্রতিযোগিতা—পূর্ব মল্লিকপুরের বার্ষিক গৌরব। সন্ধ্যায় শুরু হওয়া সেই জমজমাট বলিখেলা শেষ হয় প্রায় মধ্যরাতে।
নওশের ভাই, আসল নাম নাহিদুল, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্পগুজব করে রাত প্রায় আড়াইটার দিকে হাঁটা শুরু করলেন বাড়ির পথে। গ্রামটা ছোট, তবে রাস্তাঘাটে আলো কম। চারদিক নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে দূরে শিয়ালের হাহাকার ভেসে আসছিল।
বাড়ির পথে পশ্চিম পাশে পড়েছে পুরনো এক কবরস্থান—পদ্মাপাড় গোরস্থান। আগে এখানে গ্রামের লোকজন কবর হতো, এখন নতুন কবরস্থান হয়েছে উত্তর দিকে, কিন্তু পুরনো গোরস্থানে রাত-বিরাতে কেউ যায় না। কথিত আছে, এখানে নাকি রাতের আঁধারে অদ্ভুত সব আওয়াজ শোনা যায়।
নাহিদুল সাহসী ছেলে, এসব বিশ্বাস করেন না। কিন্তু সেদিন যখন পদ্মাপাড় কবরস্থানের কাছাকাছি এলেন, কেমন যেন বুক ধড়ফড় করতে লাগল। হঠাৎ ঠান্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা লাগল গায়ে, আর গা কাঁপতে শুরু করল।
তিনি থেমে গেলেন। ঠিক তখনই শুনতে পেলেন—কান পাতলেই বোঝা যায়, গোরস্থানের মাঝামাঝি কোথাও এক গম্ভীর গলায় কেউ দোয়া-দরুদ পড়ছে। স্বরটা পরিচিত মনে হলো। তিনি একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, একজন লোক সাদা চাদর পেঁচিয়ে এক কবরের পাশে বসে কোরআন পড়ছেন।
নাহিদুল চিনে ফেললেন—এই তো, ওটা তো হাশেম মোল্লা, পাশের গ্রামের হুজুর। ভালো মানুষ, মসজিদের ইমাম। মনে সাহস পেয়ে গোরস্থানে উঠে গেলেন। পাশে গিয়ে বসতেই হুজুর মুখ তুললেন।
হাসিমুখে বললেন,
— “এই রাতে এখানে? কী হয়েছে বাবা?”
নাহিদুল বললেন,
— “বলিখেলা দেখে আসছি। কিন্তু এখানে এসে বুক ধড়ফড় করতেছিল, তাই আপনাকে দেখে সাহস করে উঠলাম।”
হুজুর বললেন,
— “ভয় পাওয়ার কিছু নাই, কিন্তু এই রাতের কবরস্থানে বেশি থাকা ঠিক না। যাও, বাড়ি যাও।”
— “আপনি যদি একটু দিয়ে আসতেন?” নাহিদুল মিনতি করল।
হাশেম মোল্লা একটু থেমে বললেন,
— “চলো, তাহলে কিছুটা দিয়ে দেই।”
দুজন একসাথে হাঁটা শুরু করল অন্ধকার রাস্তা ধরে। চারদিক নীরব, পায়ের নিচে শুকনো পাতার খসখস শব্দ। মাঝপথে এসে হুজুর থামলেন।
— “এবার তুমি নিজেই যেতে পারবা। ভয়ের কিছু নাই।”
কিন্তু নাহিদুল বলল,
— “আর একটু যদি যেতেন… মা তো দরজা খুলে ঘুমিয়ে থাকবে না।”
হুজুর মাথা নাড়লেন,
— “আচ্ছা, চল।”














