“দেবদাস”
“দেবদাস” উপন্যাসের শেষের দিকে একটা লাইন খেয়াল করবেন- “দেবদাস ভাবিয়াছিলো তাহাকে ছাড়া পার্বতী মরিয়া যাবে, অথচ তাহার জ্বরটুকু অবধি আসিলো না।”
পার্বতীর জ্বর কেনো আসেনি জানেন? কারণ পার্বতী দেবদাসকে প্রচণ্ড ভালোবাসতো ঠিকই, কিন্তু সে ভালোবাসার কাছে নিজের আত্মসম্মানকে সস্তা দামে বিক্রি করেনি। দেবদাসকে ভালোবেসে বিনিময়ে পার্বতী শুধু পেয়েছিলো অপেক্ষা, উপেক্ষা, অপমান আর লাঞ্ছনা। তবুও সে সবকিছু মেনে নিয়ে দেবদাসের হয়েই সারাজীবন থাকতে চেয়েছিলো। তার ভালোবাসা নিখাদ ছিলো বলেই লোকলজ্জা ভুলে সমাজের সব অপমান-অপবাদ মাথা পেতে নিয়ে সবার সামনে সে নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছিলো। কিন্তু যখন দেবদাস সেই ভালোবাসার দাম দিতে ব্যর্থ হলো, পার্বতীর আত্মসম্মানে আঘাত করলো, পার্বতী তখন দেবদাসকে ত্যাগ করতে এক মুহূর্তও খরচ করেনি- সেই দেবদাসকে যে তার ছোটবেলার খেলার সাথী, কৈশোরের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং যৌবনের প্রেম। সারাজীবন পার্বতীর ধ্যান-জ্ঞান সর্বস্ব জুড়ে ছিলো শুধু দেবদাস। কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে পার্বতী বেছে নেয় এমন খাপছাড়া একজনকে যে তার বয়সে বহুগুণ বড়, বিপত্নীক এবং তিন সন্তানের জনক। কেনো এমন একজনকে বেছে নিয়েছিলো জানেন? অনেকে বলবে অর্থবিত্ত আর সামাজিক মর্যাদার জন্য। না, পার্বতী তাকে বেছে নিয়েছিলো কারণ সে পার্বতীকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিয়েছিলো, সমাজে সবার সামনে পার্বতীর হাত ধরে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে সে কার্পণ্য করেনি।
অন্যদিকে, দেবদাসও পার্বতীকে ভালোবাসতো। কিন্তু পরিবার আর সমাজের সামনে নিজের ভালোবাসার কথা বলার, সবার সামনে পার্বতীর হাত ধরে ভালোবাসার সাক্ষ্য দেবার মতো সাহসটুকু তার হয়নি। উগ্র-মেজাজি বাবার সাথে রাগ করে সে বাড়ি ছাড়লো ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে পার্বতীকে নিতে সহসাই ভুলে গেলো। যে পার্বতীর ভালোবাসা অনেকের কাছে আরাধ্য, সেই ভালোবাসা পেয়েও হতভাগা দেবদাস বাকিটা জীবন কাটালো পার্বতীকে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে। আত্মঅহমিকা আর কাপুরুষতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে শেষ পর্যন্ত পার্বতীর সদর দরজার সামনে এসেই সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলো- বুকে এক আকাশ সমান যন্ত্রণা, অনুশোচনা আর প্রায়শ্চিত্তের অগ্নিদগ্ধ চিতা নিয়ে।
পুরুষের ভালোবাসা এমনই। যা কিছু সহজে ধরা দেয়, পুরুষ তার কদর করতে জানে না। সহজলভ্য ভেবে অবহেলা করে। কিন্তু নারী যাকে ভালোবাসে তার জন্য পৃথিবীর সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে দ্বিধা করে না। তবে যখন সেই ভালোবাসার মানুষটাই মূল্যায়ন না করে, অবহেলা করে, আত্মসম্মানকে দুমড়ে মুচড়ে দেয়, তখন তাকে ত্যাগ করতেও নারীর দু’বার ভাবতে হয় না। একটা নারী কখনোই হুট করে ছেড়ে চলে যায় না। সে আপনাকে বারবার সুযোগ দিবে, সময় দিবে। এরপরও যদি আপনি তার ভালোবাসাকে অপমান করতেই থাকেন, তাহলে সে আপনাকে এমনভাবে ছেড়ে চলে যাবে যেনো আপনার কোনো অস্তিত্ব কখনও ছিলোই না। নারীর নীরবতাই হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ। নারীর ভালোবাসা যেমন ভয়ংকর, তেমনই তার ঘৃণার তীব্রতাও অসহনীয়।
“ভালোবাসি” শুধু মুখে বললেই হয় না, দায়িত্ব নিতে জানতে হয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে নয় বরং প্রকাশ্যে ভালোবাসার স্বীকৃতি দিতে জানতে হয়। যদি কাউকে ভালো রাখার দায়িত্ব আপনি নিতে না পারেন, তাহলে তার জীবনের সাথে জড়ানোরও কোনো দরকার নেই।














