চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি)। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়। সে হিসাবে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই বর্তমান পরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
তবে মেয়াদ শেষ হলেও নিজের চেয়ার ছাড়তে নারাজ বর্তমান মেয়র বিএনপির চট্টগ্রাম নগর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। এ নিয়ে নগরীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আইনি বিতর্ক।
মেয়রের দাবি, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে ‘সেকশন সিক্স’ প্রযোজ্য হবে এবং প্রশাসক নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই।
১৫ বছর আগেই রুদ্ধ ফেরার পথঃ
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়র যে ধারার কথা বলছেন, সেটির রক্ষাকবচ অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারায় ২০১১ সালে সংশোধনী এনে মেয়াদোত্তীর্ণ পরিষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ বাতিল করা হয়।
২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারি গেজেটের মাধ্যমে আগের সেই শর্ত পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে ধারাটিতে শুধু বলা আছে—করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর।
আইনের পরিশিষ্ট অংশেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে আগের পরিষদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে আইনবিদদের মতে, মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেয়রের ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়ার কথা।
প্রশাসক নিয়োগের নজির আছেঃ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে প্রশাসক নিয়োগের উদাহরণও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করোনা পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত হলে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২০ সালের ৪ আগস্ট খোরশেদ আলম সুজন-কে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময়ও স্থানীয় সরকার আইনের বাধ্যবাধকতার কারণেই বিদায়ী মেয়রকে আর দায়িত্বে রাখা হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প নেই।
প্রশাসক নিয়োগ ছাড়া উপায় নেইঃ
স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯–এর ৬০ ধারা অনুযায়ী (২০১১ সালের সংশোধনীসহ) কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে সরকার নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।
এই বিধান অনুযায়ী, ডা. শাহাদাত হোসেনের ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মন্ত্রীর মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে আইনই এখানে শক্তিশালী।
তিন সিটিতে নির্বাচনের প্রস্তুতিঃ
মেয়াদ শেষ হওয়ার এই টানাপোড়েনের মধ্যেই চট্টগ্রামসহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা হওয়ায় আজই চট্টগ্রাম সিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আইন অনুযায়ী মেয়াদের শেষ ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যেভাবে মেয়র হন শাহাদাতঃ
২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালতের রায়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। সেখানে শাহাদাত পান ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট।
নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তিনি ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন। তিন বছর পর আদালত মামলার রায় দিলে নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তাকে মেয়র ঘোষণা করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এরপর ১৭ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে তার মেয়র পদ নিশ্চিত করে।
এখন প্রশ্ন একটাই—আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মেয়র কি থাকবেন, নাকি প্রশাসক নিয়োগ হবে? চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।