ইউনুস (আঃ)-এর তওবার কাহিনী
✨ নিনেভেহ শহরের অলিতে-গলিতে এক আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দিচ্ছিলেন হযরত ইউনুস (আঃ)। কিন্তু যুগের পর যুগ অতিবাহিত হলেও পাথুরে হৃদয়ের অধিকারী সেই মানুষগুলো তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। তারা তাঁকে উপহাস করল, মিথ্যাবাদী বলল। অবশেষে একরাশ অভিমান আর বিরক্তি নিয়ে আল্লাহর চূড়ান্ত অনুমতির অপেক্ষা না করেই ইউনুস (আঃ) শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন।
১. উত্তাল সমুদ্র ও তকদিরের লটারি
ইউনুস (আঃ) একটি যাত্রীবাহী জাহাজে উঠলেন। মাঝ সমুদ্রে পৌঁছাতেই আকাশ কালো হয়ে এল এবং শুরু হলো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। জাহাজটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো। যাত্রীরা মনে করল, তাদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে তার রবের অবাধ্য হয়েছে। সিদ্ধান্ত হলো লটারির মাধ্যমে একজনকে সাগরে ফেলে দেওয়া হবে।
তিন তিনবার লটারিতে হযরত ইউনুস (আঃ)-এর নাম উঠল। আল্লাহর নবী বুঝতে পারলেন, অনুমতি ছাড়া শহর ত্যাগ করার কারণে আজ তিনি পরীক্ষায় পড়েছেন। তিনি নিজেই সাগরের উত্তাল লোনাজলে ঝাঁপ দিলেন।
২. মাছের পেটে অন্ধকার কারাবাস
ঝাঁপ দেওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহর নির্দেশে এক বিশাল মাছ তাঁকে গিলে ফেলল। কিন্তু অলৌকিকভাবে মাছটি তাঁকে চিবাল না বা কোনো ক্ষত করল না। মাছের পেটের সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে, যেখানে সমুদ্রের পানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না, সেখানে ইউনুস (আঃ) নিদারুণ একাকিত্ব অনুভব করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর ভুল। তিনি সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন এবং কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন সেই অমর বাণী:
“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন।” > (হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপর জুলুম করেছি।)
৩. মুক্তি ও আল্লাহর কুদরত
মাছের পেটের ভেতরেও যখন ইউনুস (আঃ)-এর তাসবিহ আর দোয়ার গুঞ্জন থামল না, তখন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বললেন, “আমার বান্দা আমাকে ডাকছে।” আল্লাহ মাছটিকে আদেশ দিলেন তাঁকে তীরে উগরে দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময় পর ইউনুস (আঃ) একটি নির্জন বালুকাময় তীরে নিক্ষিপ্ত হলেন। তিনি তখন অত্যন্ত দুর্বল।
আল্লাহর কুদরত দেখুন! তাঁর ছায়ার জন্য সেখানে একটি লতা জাতীয় গাছ (কদু গাছ) গজিয়ে দেওয়া হলো। সেই গাছের ফল ও পাতা তাঁকে রোদ থেকে রক্ষা করল এবং পুষ্টি জোগাল। তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।
৪. নিনেভেহ-এর পরিবর্তন ও একশ হাজার মুমিন
সুস্থ হয়ে আল্লাহর আদেশে তিনি পুনরায় নিনেভেহ শহরে ফিরে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর চোখ জুড়িয়ে গেল। তাঁর অনুপস্থিতিতে পুরো শহর তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এসেছিল। এক লক্ষেরও বেশি মানুষ সেদিন নবীকে সানন্দে গ্রহণ করল এবং নিনেভেহ পরিণত হলো মুমিনদের এক পুণ্যভূমিতে।
গল্পের শিক্ষা:
বিপদে দোয়ার শক্তি: যখন দুনিয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন “দোয়ায়ে ইউনুস” আরশের দরজা খুলে দেয়।
আল্লাহর ক্ষমা: নবীরাও যদি কোনো ভুল করেন, তবে আল্লাহ তাঁদেরও তওবা করতে শেখান। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য তওবার গুরুত্ব আরও বেশি।
ধৈর্য: আল্লাহর কোনো সিদ্ধান্ত আসার আগে আমাদের অধৈর্য হওয়া উচিত নয়।
সঠিক সূত্র/রেফারেন্স
এই অলৌকিক ঘটনাটি পবিত্র কুরআনের কয়েকটি সূরাতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে:
সূরা ইউনুস: (আয়াত: ৯৮)
সূরা আম্বিয়া: (আয়াত: ৮৭-৮৮)
সূরা আস-সাফফাত: (আয়াত: ১৩৯-১৪৮)
তাফসীরে ইবনে কাসীর: সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা।














