হযরত আলী (রাঃ)-এর দান ও জান্নাতের ঘোড়া
একবার হযরত ফাতেমা (রাঃ) অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন এবং বিছানা থেকে ঠিকমতো উঠতে পারছিলেন না। অন্যদিকে, বাড়িতে টানা তিন দিন যাবত কোনো খাবার ছিল না। খাবার না খেয়ে এবং অসুস্থতার কারণে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতেও তখন কোনো অর্থ ছিল না।
তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর, হযরত ফাতেমা (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-এর হাতে একটি পুরনো কাপড় দিয়ে বললেন:
“হে আমার প্রিয় স্বামী! আব্বাজান হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদের বিয়ের সময় এই কাপড়টি আমাকে হাদিয়া দিয়েছিলেন। এটি অত্যন্ত বরকতময় কাপড়। আমার মন চাইছে না এটি বিক্রি করতে, তবুও যেহেতু আজ তিন দিন ধরে আমরা না খেয়ে আছি, তাই আপনাকে এটি দিচ্ছি। আপনি এটি বাজারে বিক্রি করে সেই মূল্য দিয়ে কিছু খাবার কিনে আনবেন।”
বরকতময় কাপড় ও আল্লাহর সাহায্য
হযরত আলী (রাঃ) বরকতময় কাপড়টি নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলেন। কাপড়টি অত্যন্ত পুরনো হওয়ায়, অনেক ক্রেতাকে দেখানোর পরও কেউ তা কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। আলী (রাঃ) একেবারেই নিরাশ হয়ে পড়লেন এবং আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন: “হে আল্লাহ! আজ তিন দিন যাবত নবীজির মেয়ে ফাতেমা এবং হাসান-হোসেন না খেয়ে আছে। আজকে যদি এই কাপড়টি বিক্রি করতে না পারি, তবে আজও তারা না খেয়ে থাকবে। আপনি এই কাপড়টি বিক্রি করার জন্য একজন ক্রেতার ব্যবস্থা করে দিন!”
দোয়া করার পর একজন ক্রেতা এলেন এবং বললেন, “আলী! তুমি কি এই কাপড়টি বিক্রি করতে চাও?”
আলী (রাঃ) বললেন, “আমি এই কাপড়টি বিক্রি করার জন্যই বাজারে এনেছি।”
আলী (রাঃ) জানতেন, কাপড়ের মূল্য সর্বোচ্চ এক বা দুই দিরহাম হতে পারে। তাই তিনি কোনো দাম না চেয়ে বললেন, “জনাব, আপনার যা খুশি আপনি তাই প্রদান করবেন।”
তখন লোকটি বললো, “আমি ছয় দিরহাম দিয়ে এই কাপড়টি ক্রয় করতে চাই। তুমি কি বিক্রয় করতে রাজি আছো?”
আলী (রাঃ) অত্যন্ত খুশি হয়ে রাজি হয়ে গেলেন এবং ছয় দিরহামের বিনিময়ে কাপড়টি হস্তান্তর করলেন।
ফেরেশতাদের পরীক্ষা ও আলীর নিঃস্বার্থ দান
আলী (রাঃ) সেই ছয় দিরহাম নিয়ে খাবার কেনার জন্য যাচ্ছিলেন। ওদিকে, আল্লাহর একদল ফেরেশতা অন্য একদল ফেরেশতার সাথে আলোচনা করছিল যে, সাহাবীরা কি শুধু সুখে থাকা অবস্থাতেই দান করেন, নাকি যখন তাঁদের নিজেরও প্রয়োজন, তখনও করেন?
এই পরীক্ষার জন্য আল্লাহ তা’আলা একজন ফেরেশতাকে ফকিরের বেশে হযরত আলী (রাঃ)-এর সামনে পাঠালেন।
ফকিরবেশী সেই ফেরেশতা এসে বললেন: “হে আল্লাহর বান্দা! আজ কয়েক দিন যাবত আমি না খেয়ে আছি। ক্ষুধার জ্বালায় আমার শরীর নড়াচড়া করার শক্তি নেই। আপনার নিকট যদি কোনো অর্থ থাকে, দয়া করে আমাকে দান করুন।”
আলী (রাঃ) চিন্তিত হলেন। তিনি ভাবলেন: ‘আজ তিন দিন পর ফাতেমা ও সন্তানদের জন্য খাবার কেনার অর্থ হাতে এসেছে, কিন্তু এই অসহায় বান্দাও ভিক্ষা চাইছে।’
চূড়ান্তভাবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবার উপরে। তিনি মনে মনে ভাবলেন: ‘আল্লাহ আমার উত্তম অভিভাবক।’ অতঃপর তিনি তাঁর ছয় দিরহামের পুরোটাই সেই ফকিরকে দান করে দিলেন।
অলৌকিক ঘোড়া ও বরকতময় ব্যবসা
অত্যন্ত চিন্তিত ও পেরেশান মনে তিনি সামনে চলতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর সামনে এক ব্যক্তি একটি লাল ঘোড়া নিয়ে আসলেন এবং বললেন: “হে শেরে খোদা আলী! আপনি কি আমার কাছ থেকে এই ঘোড়াটি ক্রয় করতে চান?”
আলী (রাঃ) বললেন, “আমার হাতে তো কোনো অর্থ নেই, আমি কীভাবে ঘোড়া কিনব?”
লোকটি বললো: “আমি বাকিতে এই ঘোড়াটি বিক্রয় করব। আপনি এটি নিয়ে ব্যবসা করুন। ব্যবসায় লাভ হলে আমার মূল্য পরিশোধ করে দেবেন।”
আলী (রাঃ) ভাবলেন, যেহেতু বাকিতে পাওয়া যাচ্ছে, এতে আল্লাহর কোনো হুকুম থাকতে পারে। তিনি ১০০ দিরহামের বিনিময়ে ঘোড়াটি ক্রয় করলেন।
তিনি ঘোড়াটি বাজারে নিয়ে গেলেন। সেখানে আরেকজন ক্রেতা এসে তা ১৬০ দিরহামের বিনিময়ে কিনে নিতে চাইল। আলী (রাঃ) রাজি হয়ে গেলেন।
আলী (রাঃ) প্রাপ্ত ১৬০ দিরহাম থেকে যার কাছ থেকে ঘোড়া কিনেছিলেন, তাকে ১০০ দিরহাম পরিশোধ করে দিলেন। তাঁর কাছে ৬০ দিরহাম অবশিষ্ট রইল।
জান্নাতের লাগাম
আলী (রাঃ) ৬০ দিরহামের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ খাবার নিয়ে বাড়িতে ফিরলেন। হযরত ফাতেমা (রাঃ) এত খাবার দেখে অবাক হলেন এবং বললেন, “আমি তোমাকে যে কাপড়টি বিক্রি করতে বলেছি, তার মূল্য দিয়ে এত খাবার কেনা সম্ভব নয়! তুমি আগে প্রকৃত ঘটনা বলো, তারপর বাড়িতে প্রবেশ করবে।”
আলী (রাঃ) সব ঘটনা খুলে বললেন।
কিছু দিন পর নবী করীম (সাঃ) তাঁদের বাড়িতে এসে সব ঘটনা শুনে বললেন: “হে ফাতেমা! তুমি জানো, সেই ঘোড়াটি কে ছিল, আর প্রথম ক্রেতাই বা কে ছিল? প্রথম ক্রেতা ছিলেন জিবরাঈল (আঃ) এবং ঘোড়াটি ছিল আল্লাহ্র বিশেষ এক মাখলুক। আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছিলেন।”
নবীজি (সাঃ) আরও বললেন: “মা ফাতেমা! যে কাপড়টি আলী বিক্রি করেছিল, আল্লাহ তা জান্নাতে সংগ্রহ করে রেখেছেন। আর যে ঘোড়াটি দিয়ে আলী ব্যবসা করেছিল, সেই ঘোড়াটিও আল্লাহ জান্নাতে সংগ্রহ করে রেখেছেন। কিয়ামতের দিন যখন তুমি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তুমি সেই ঘোড়ার উপর থাকবে, আর সেই কাপড়টি হবে ঘোড়ার লাগাম। আর সেই লাগামটি ধরে থাকবে আলী! এর মাধ্যমে তোমার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে তোমার স্বামী আলী!”
শিক্ষা:
অভাব ও প্রয়োজনের মুহূর্তে আল্লাহর রাস্তায় নিঃস্বার্থ দান করলে আল্লাহ দশগুণ বা তারও বেশি বরকত দান করেন। আল্লাহর প্রতি ভরসা ও দানশীলতাই বান্দাকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করে।














