দেশনেত্রীর মৃত্যুতে চলছে রাষ্ট্রীয় শোক
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গত বুধবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন শুরু হয়েছে।
শুক্রবার পর্যন্ত এই শোক পালন করা হবে। রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব মিশনেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রয়েছে। এ উপলক্ষে বুধবার রাষ্ট্রীয়ভাবে এক দিনের ছুটিও পালন করা হয়। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সারাদেশে। নেতাকর্মীদের কান্না, মানুষের নীরবতা আর ভারী বাতাসে যেন স্তব্ধ হয়ে আছে দেশ। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গণপরিবহন সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটিই নাম, ‘বেগম খালেদা জিয়া’। স্মৃতিচারণ আর বেদনার কণ্ঠে আফসোস শোনা যাচ্ছে সর্বত্র।
ধর্ম, দল-মত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বলছেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। দীর্ঘদিন যার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ঐক্য ও গণতন্ত্রের কথা, তার বিদায়ে গণতন্ত্রকামী মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করছেন। বেগম খালেদা জিয়ার রূহের মাগফিরাত কামনায় আজ শুক্রবার দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে দলীয়ভাবে সাত দিনের শোক পালন করছে বিএনপি। নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের সব কার্যালয়ে সাত দিন কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ সময় দলের সব স্তরের নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করছেন। নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খোলা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করছেন বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, সরকারি ব্যক্তিত্ব এবং বিএনপি নেতাকর্মীরা।
জিয়া-খালেদার সমাধিস্থল সবার জন্য উন্মুক্ত
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুরে সর্বসাধারণের প্রবেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষসহ দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকে ওই এলাকায় ভিড় করেন। উদ্যান বন্ধ থাকায় বিজয় স্মরণি মোড়ে উদ্যানের প্রবেশ মুখে ব্যারিকেডে অপেক্ষায় থাকেন অনেকে। সমাধিস্থলে যেতে না পেরে অনেকে সড়কে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন।
জানা যায়, সংস্কার কাজ চলমান থাকায় বন্ধ রাখা হয় ভেতরে প্রবেশ। এখন তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। পুরো উদ্যানের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে অন্য বাহিনীর সদস্যরাও। বুধবার বিকেল ৩টার দিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আবদুল মালেকের ইমামতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেল পৌনে ৫টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। গত মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া মারা যান।
উল্লেখ্য, গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসের সংক্রমণজনিত শ্বাসকষ্ট নিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে নিউমোনিয়া দেখা দেয় এবং কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ পুরোনো জটিলতা আরও বেড়ে যায়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়, যেখানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সার্কের শোক প্রকাশ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)। সার্কের মহাসচিব মো. গোলাম সারওয়ার এক শোকবার্তায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে বাংলাদেশ একজন আপসহীন গণতন্ত্রকামী নেত্রীকে হারালো। তার জীবন ও নেতৃত্ব দেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
শোকবার্তায় বলা হয়, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনবার দায়িত্ব পালনকালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের বিস্তার, নারী ক্ষমতায়ন এবং শিক্ষাখাতে। বিশেষ করে কন্যাশিশু শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়েছিল, তাকে বিশ্বব্যাংক ‘এশিয়ার পরবর্তী টাইগার অর্থনীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
মহাসচিব আরও স্মরণ করেন, ১৯৯৩-৯৫ ও ২০০৫-০৭ মেয়াদে সার্কের চেয়ারপারসন হিসেবে তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা সংস্থার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে বড় ভূমিকা রেখেছিল। একই সঙ্গে সার্ক প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানও শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার, বিএনপি নেতাকর্মী ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শোকবার্তায় তার রূহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দিতে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়। সার্ক মহাসচিব আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের জনগণ এ শোক কাটিয়ে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে তার আদর্শ থেকে প্রেরণা পাবে।
জিয়া উদ্যান এলাকায় কড়া নিরাপত্তা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধি এলাকায় দাফনের দ্বিতীয় দিনও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাজধানীর জিয়া উদ্যানের মূল এলাকায় কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ভেতরে পবিত্র কুরআনের খতম পাঠ করছেন বেশ কয়েকজন হাফেজ। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে জিয়া উদ্যানের মূল ফটকের সামনে (বেইলি ব্রিজ) এমন দৃশ্য দেখা যায়। সংসদ ভবনের বিপরীতে শহীদ জিয়ার মাজারে পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বে ছিলেন। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত মাজারে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ছাড়া কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাফেজরা মাজারে প্রবেশ করে কুরআনের খতম পাঠ শুরু করেন। মাজারের মূল ফটকসহ পুরো এলাকা কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। এর আগে সমাধি এলাকার সামনের সড়ক পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল।
প্যারিসে দোয়া মাহফিল
আপসহীন রাষ্ট্রনায়ক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় ফ্রান্স বিএনপির উদ্যোগে এক দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার দুপুর ২টায় প্যারিস সংলগ্ন কাত্র শেমাঁ অবেরভিলিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটি জাতীয় মসজিদে এ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন, ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সিরাজুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন, ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমএ তাহের। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মাহফিলে বক্তারা বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি আমৃত্যু আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন। যতদিন এ দেশের ভূখণ্ডে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই অব্যাহত থাকবে, ততদিন মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক জনগণ তার জীবন থেকে সাহস ও প্রেরণা খুঁজে নেবে। দোয়া মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ দূতাবাস ফ্রান্সের মিশন উপপ্রধান এহসানুল হক, বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর ও দূতালয় প্রধান ওয়ালিদ বিন কাশেম, দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব কেএফএম শারহাদ শাকিল, ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম রাঙ্গা ও শাহ জামাল, সহ-সভাপতি রশিদ পাটোয়ারী, তসলিম আহমেদ, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন পাটোয়ারী, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম ও জুনেদ আহম্মেদ, সাবেক অর্থবিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম শিপার, যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এসএম মিল্টন সরকার।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্স যুবদলের সভাপতি আহমেদ মালেক, সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুল কুদ্দুস, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লায়েক আহমেদ তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল ইসলাম সায়েম, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব এম আলী চৌধুরী, জাসাসের সদস্য সচিব মেহেদি হাসান রনিসহ ফ্রান্স বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং দলমত নির্বিশেষে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। মাহফিলে ফ্রান্স বিএনপির পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মাদ ইউনূস ও তার উপদেষ্টা পরিষদ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সকল সদস্যকে খালেদা জিয়ার প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। দোয়া মাহফিল পরিচালনা করেন, ফ্রান্স যুবদলের সভাপতি আহমেদ মালেক।














