বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থ ও আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি: একটি পুনর্মূল্যায়ন
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তি-রাজনীতির প্রভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিশেষত ভারতের সঙ্গে অসম শক্তি-সম্পর্ক (asymmetric power relations) বাংলাদেশের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে কাজ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক প্রকল্প থেকে সরে আসার উদ্যোগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ পুনর্মূল্যায়নের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভারত কর্তৃক প্রস্তাবিত এবং পূর্ববর্তী সরকার কর্তৃক অনুমোদিত একাধিক রেল, সড়ক, বন্দর ও জ্বালানি প্রকল্প বাহ্যিকভাবে ‘আঞ্চলিক সংযোগ’ ও ‘উন্নয়ন সহযোগিতা’র ভাষ্যে উপস্থাপিত হলেও, রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে এসব প্রকল্প ভারতের ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিল। ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেল সংযোগ, আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর কিংবা অভয়পুর-আখাউড়া রেলপথ প্রকল্প ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের জন্য এসব প্রকল্পে কৌশলগত লাভ ছিল সীমিত। বরং এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে কার্যত একটি ট্রানজিট করিডরে রূপান্তর করার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল।
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তিগুলো দক্ষিণ এশীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বঙ্গোপসাগরের ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে সংবেদনশীল। এসব বন্দরের মাধ্যমে ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব অনুযায়ী, ছোট রাষ্ট্রসমূহ যখন বৃহৎ শক্তির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (strategic autonomy) গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জ্বালানি খাতে প্রস্তাবিত পাইপলাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার একটি কাঠামো তৈরি করার ঝুঁকি বহন করছিল। একক উৎসনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ বাজার প্রতিযোগিতা হ্রাস করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। এখানে বাংলাদেশের বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তোলে।
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বিশেষত ফেনী নদী ও ফারাক্কা বাঁধ সংক্রান্ত ইস্যু, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্পর্শকাতর অধ্যায়। উজানের একতরফা পানি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও খরার চক্র তীব্রতর হয়েছে—যা পরিবেশগত ন্যায়বিচার (environmental justice) এবং আন্তর্জাতিক নদী আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এসব প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের উদ্যোগকে কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত পুনর্নির্ধারণ (strategic recalibration) হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নির্দেশ করে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং বহুমুখী বৈদেশিক সম্পর্ক (multi-aligned diplomacy) গঠনের পথে সহায়ক হতে পারে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব কেবল উন্নয়ন সূচক বাড়ানো নয়, বরং এমন উন্নয়ন নিশ্চিত করা যা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অতএব, সাম্প্রতিক এই অবস্থানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বাঁকগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন কখনোই সার্বভৌমত্বের বিকল্প হতে পারে না এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসের মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই পরিশোধ করতে হয়।











