তাড়াশে কৃষিজমির সর্বনাশ: আইনের তোয়াক্কা না করে ছড়াচ্ছে অবৈধ পুকুর খনন
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় উর্বর কৃষিজমি কেটে দিন-রাত অবাধে পুকুর খনন চলছে। ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’ কার্যত উপেক্ষিত থাকায় কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন এখন যেন প্রকাশ্য রহস্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তাড়াশ উপজেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ২শ’ ২৭টি অবৈধ পুকুর খনন করা হয়েছে। গত এক দশকে উপজেলায় ১১ হাজার ২শ’ ৫৭ বিঘা কৃষিজমি কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদনের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু অভিযোগ করে বলেন, “ডিসেম্বর মাস থেকে আবারও নতুন করে পুকুর খনন শুরু হয়েছে। আইন লঙ্ঘন হলেও উপজেলা প্রশাসন কিংবা থানা পুলিশের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলে অবাধেই কৃষিজমি কেটে পুকুর খনন চলছে।”
প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ, বড় জমির মালিকরা ইচ্ছেমতো পুকুর খনন করায় আশপাশের দরিদ্র কৃষকদের জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে এসব জমি বছরের পর বছর অনাবাদী থেকে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নওগাঁ ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া ও গোয়াল মৌজার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ আবাদযোগ্য মাঠ কেটে প্রায় ৬০ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর খনন করা হচ্ছে। এছাড়া মহিষলুটী গ্রামে ৫০ বিঘা, পংরৌহালী বিলে ২৫ বিঘা, চকরোচুল্লা বাবলাতলার পাশে ২৫ বিঘা, মান্নান নগর সড়ক সংলগ্ন ঘরগ্রাম মাঠে ৫ বিঘা আয়তনের পুকুর খনন চলছে। পঁওতা-তেতুলিয়া সড়কের ব্রিজের মুখ বন্ধ করেও পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে। তাড়াশ পৌর এলাকার কাউরাইল, সোলাপাড়া, আমশরা মাঠ ও পশ্চিম ওয়াপদা বাঁধের আশপাশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ পুকুর খনন হচ্ছে।
বাঁশবাড়ীয়া গ্রামের কৃষক আবেদ আলী, আব্দুর রশিদ ও আকছেদ আলী জানান, ৬০ বিঘা আয়তনের পুকুরটি খনন করা হলে শাস্তান ও সোলাপাড়া মাঠের হাজারো বিঘা কৃষিজমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে।
মাধবপুর গ্রামের ছোহরাব হোসেন ও খোকা প্রামাণিক, মথুরাপুর গ্রামের শামসুল হক, ছাবেদ আলী ও জুরান আলীসহ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলেন, তাড়াশ সদর ইউনিয়নের মাধবপুর, মথুরাপুর, বিদিমাগুড়া, চক গোপীনাথপুর, বোয়ালিয়া ও সোলাপাড়া এলাকার মাঠে প্রায় ছয় বছর ধরে পানি জমে আছে। একসময় এসব জমিতে বছরে তিন ফসল হতো, কিন্তু অবৈধ পুকুর খননের কারণে এখন কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ পুকুর খননের প্রতিবাদে শিগগিরই বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয়রা। এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মাধবপুর গ্রামের মাঠে অবৈধ পুকুর খননের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা একটি এক্সেভেটর মেশিনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
উল্লেখ্য, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ অনুযায়ী ভূমি সংক্রান্ত সব অপরাধ আমলযোগ্য। এই আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীরা চাইলে থানায় মামলা করতে পারবেন এবং পুলিশ বিনা পরোয়ানায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উদ্যোগ নিলে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে চারটি পুকুর খননের ঘটনায় জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “তাড়াশে অবৈধ পুকুর খননের বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। কৃষিজমি রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।”











