অঞ্জনা
অঞ্জনা
অঞ্জনা দেবী, বয়স এখন ছেচল্লিশ। এক সময় সংসারে হাসি ছিল, স্বামী ছিলেন পাশে, মেয়েটা ছোট ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন এক্সিডেন্টে স্বামী চলে গেলেন চিরদিনের মতো। তারপর থেকেই জীবনের গতি যেন থেমে গিয়েছিল। অফিসের ছোট চাকরি, সংসারের টানাপোড়েন, আর চারপাশের মানুষের ফিসফিসানি—সব মিলিয়ে অঞ্জনার দিনগুলো শুকনো, একঘেয়ে আর নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিল।
এক বিকেলে ক্লান্ত মনে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন কাছের লেকে। সূর্য তখন ডুবতে বসেছে। হঠাৎ এক তরুণ এগিয়ে এসে বলল,
“মাসিমা, আপনার ব্যাগটা খুলে যাচ্ছিল, তাই বন্ধ করে দিলাম।”
অঞ্জনা তাকালেন—মিষ্টি মুখ, সরল চোখ, বয়স আনুমানিক পঁচিশ। ছেলেটির নাম সৌরভ।
এরপর থেকে প্রায়ই দেখা হতে লাগল দু’জনের। কেউ কিছু বলেনি, তবু প্রতিবার দেখা হলে মনে হতো, কথাগুলো নিজের থেকেই বেরিয়ে আসে। বইয়ের দোকান, কফিশপ, লেকের ধারে—যেখানেই হোক, সৌরভ যেন একটা শান্তির আবহ নিয়ে আসে। বয়সের পার্থক্যটা যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল প্রতিটা কথায়, প্রতিটা হাসিতে।
অঞ্জনা ভাবতেন, “এ ছেলেটা এত কম বয়সে এত বোঝে কেমন করে?”
তার মনের ভেতর জমে থাকা ভয়, নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব—সব কিছু যেন ওর কাছে খোলামেলা হয়ে যেত।
একদিন সৌরভ হঠাৎ বলল,
“অঞ্জনা, আমি আর নিজেকে আটকাতে পারছি না। তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি চাই, তুমি আমার জীবনসঙ্গী হও।”
অঞ্জনা অবাক। সমাজ কী বলবে? মেয়ে কী ভাববে? নিজের বয়সের সঙ্গে ওর বয়সের তুলনা করে মনে একরাশ প্রশ্নের ঝড় উঠল। কিন্তু হৃদয়ের ভেতর থেকে একটা মৃদু কণ্ঠ যেন বলল—“তুমি তো এত বছর শুধু বেঁচে আছো, এবার একটু বাঁচো।”
সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এলো মেয়ের মুখে—
“মা, তুমি যদি সুখী হও, আমিও সুখী হবো। এই মানুষটা তোমার পাশে থাকতে চায়, ওকে হারিও না।”
তারপর একদিন, নিঃশব্দে, খুব সাধারণ আয়োজনের মধ্যেই তাদের বিয়ে হল। কেউ ঢাকঢোল পেটাল না, কিন্তু ভালোবাসার গন্ধে বাতাস ভরে গিয়েছিল।
আজ অঞ্জনা হেসে বলেন,
“ভালোবাসা বয়স মানে না। এটা সময়ের হিসেব নয়, এটা দুইটা হৃদয়ের মিলনের গল্প।”

















