আইন অমান্য করে রাতের আঁধারে কৃষিজমি, খাল ও নদীপাড় থেকে মাটি কাটছে সিন্ডিকেট; ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না পরিবেশবিধ্বংসী বাণিজ্য
ফেনী জেলায় কৃষি জমির উর্বর মাটি কেটে শতাধিক ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি জমি ব্যবহার ও সুরক্ষা আইন এবং পরিবেশ আইন অমান্য করে দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ফসলি জমির টপসয়েল (উর্বর মাটি) কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মাটিদস্যুদের সিন্ডিকেট। প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও পিকআপে করে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। মাটিবাহী এসব ভারী যানবাহনের কারণে স্থানীয় সড়কগুলোও দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলার ফেনী সদর উপজেলার বিরলী, ভগবানপুর, শর্শদী, বালিগাঁও, লেমুয়া, ছনুয়া, মোটবী ও কাজিরবাগ এবং দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর, জায়লস্কর, সিন্দুরপুর, রামনগর, এয়াকুবপুর ও মাতৃভূঞাসহ ফুলগাজী, পরশুরাম ও সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক দশক ধরে এই অবৈধ মাটি কাটার কার্যক্রম চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, লেমুয়া ও ছনুয়া ইউনিয়নের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে শত শত একর কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
ফলে লেমুয়ার দক্ষিণ লেমুয়া, মীরগঞ্জ, উত্তর চাঁদপুর ও দক্ষিণ চাঁদপুর এলাকায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে ফেনী সদরের বিরলী ও রতনপুর এলাকায় বিগত দেড় যুগ ধরে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অবাধে মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি বিরলী ও ভগবানপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করের চড়া খালের পাড়ও কেটে নেওয়া হয়েছে। এমনকি মাটি পরিবহনের সুবিধার্থে খালের পাড় এবং বন বিভাগের গাছ কেটে বিকল্প রাস্তা তৈরি করার ঘটনাও ঘটেছে।
এ ঘটনায় খবর পেয়ে ফেনী সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিন অভিযান চালান। অভিযানে কাউকে আটক করা না গেলেও তিনটি এক্সকাভেটর জব্দ করা হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
উত্তর কাশিমপুর গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে পাশের জমির মাটিও ধসে পড়ছে এবং অনেক জমি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। আগে এসব জমিতে বোরো ধান ও সরিষা চাষ হলেও এখন সেখানে ফসল উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, অনেক জমির মালিক টাকার লোভে মাটি বিক্রি করলেও অধিকাংশ কৃষক মাটি ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে জমির মাটি বিক্রি করছেন।
এসব মাটির শেষ গন্তব্য হচ্ছে জেলার বিভিন্ন ইটভাটা।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত এক মাসে রাতের বেলায় পরিচালিত ২৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এতে ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং সাতজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জব্দ করা হয়েছে মাটি কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম।
ফেনী উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু তৈয়ব বলেন, “ফসলি জমির উপরের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি মাটিতে জৈব উপাদান থাকে। এই মাটি কেটে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষিজমির মাটি কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি।”
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, “বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফসলি জমির টপসয়েল বিক্রি করা আইনত অপরাধ।
মাটি বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই সমানভাবে দায়ী—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে ফেনীতে কৃষিজমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যাবে এবং খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।