জাহারুল ইসলাম জীবন এর লেখা ও সম্পাদনা
রতি থেকে জ্যোতি☞ পর্ব:-২
দেহতত্ত্বের গহীনে মানুষের শরীর কেবল রক্ত-মাংসের কাঠামো নয়, বরং এটি মহাজাগতিক রহস্যের এক ক্ষুদ্র সংস্করণ (Microcosm)। এখানে দেহতত্ত্বে বর্ণিত কাম, মাম (মায়া), প্রেম এবং নূর- এই চারটি ধাপ মূলত: আত্মার উত্তরণের একেকটি সোপান। নিচে এর নিগূঢ় বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:-
**১. কাম:- রতি ও সৃষ্টির আদি কাঁচামাল:- দেহতত্ত্বে ‘কাম’ হলো সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। এটি একদিকে যেমন ধ্বংসের কারণ (কালনাগিনী), অন্যদিকে এটিই সাধনার প্রাথমিক জ্বালানি।
** তাত্ত্বিক রহস্য:- কাম যখন কেবল জৈবিক চাহিদা হিসেবে নির্গত হয়, তখন তা আধ্যাত্মিক অপচয়। কিন্তু যখন এই কাম শক্তিকে ‘নারী-ভাবনা’ বা ‘মহামায়া’র পবিত্রতায় জারিত করা হয়, তখন তা ‘রতি’তে রূপান্তরিত হয়।
** কোরআনিক ইশারা:- আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রবৃত্তিকে (নফ্স) তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। কাম যখন অনিয়ন্ত্রিত, তখন তা ‘নফ্সে আম্মারা’ বা মন্দ কাজের- আদেশদাতা। সাধক একে দমনের পরিবর্তে শোধন করে ‘নফ্সে লাওয়ামা’ বা অনুতপ্ত হৃদয়ে রূপান্তর করেন।
**২. মাম (মায়ারস/মায়া) শক্তির ভারসাম্য ও নারীত্বের আধ্যাত্মিকতা:- চিত্রে ‘মাং’ বা ‘মাম (মায়া)’ শব্দটি নারীর সেই বিশেষ আধ্যাত্মিক রসকে নির্দেশ করে, যা পুরুষের রুক্ষ কামকে শীতল প্রেমে রূপান্তরিত করে।
** তাত্ত্বিক রহস্য:- নারী এখানে কেবল ভোগের বস্তু নয়, বরং সে স্রষ্টার ‘জামাল’ বা সৌন্দর্য গুণের আধার। পুরুষের কাম (তৈজস শক্তি) যখন নারীর মাম (মায়ারস/মায়া বা আকর্ষণ শক্তি) এর সাথে মিলিত হয়, তখনই সৃষ্টি হয় একটি ভারসাম্য।
** হাদিসের ইশারা:- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের জগতের তিনটি বস্তু আমার নিকট প্রিয় করা হয়েছে- সুগন্ধি, নারী এবং নামাজের শীতলতা।” এখানে নারীর প্রতি প্রিয়তা কেবল দৈহিক নয়, বরং এটি সেই আধ্যাত্মিক প্রশান্তি যা সাধকের কামকে প্রেমে রূপান্তর করে।
**৩. প্রেমের রতি হতে জ্যোতিতে উত্তরণের মহাজাগতিক সেতুবন্ধন:- প্রেম হলো সেই ‘পরশপাথর’ যা কামের তামা স্পর্শ করলে তা নূরের সোনা হয়ে যায়। আপনার ভাষায়-রতির সাথে মতির মইথন-ই হলো প্রেম।
** তাত্ত্বিক রহস্য:- প্রেমহীন মিলন কেবল দেহের ঘর্ষণ, যা রতিকে অপচয় করে আয়ু কমিয়ে দেয়। কিন্তু প্রেমযুক্ত মইথনে রতি উর্ধ্বগামী হয়ে মস্তিষ্কের ‘মুকিম’ বা জ্যোতি দেশে পৌঁছায়। এটি-ই হলো কালনাগিনীর বিষকে অমৃতে রূপান্তর করার মিরাক্কেলীয় সাধন প্রক্রিয়া।
** আধ্যাত্মিক দর্শন:- সুফিবাদে একে বলা হয় ‘ইশকে মেজাজি’ (লৌকিক প্রেম) থেকে ‘ইশকে হাকিকি’ (ঐশী প্রেম) এ উত্তরণ। যারা পবিত্রতা বজায় রেখে প্রেম করে, তাদের রতি- শক্তিতে পরিণত হয়ে ‘নূরানি আভা’ তৈরি করে।
**৪. নূর-ফানা ও পরম সত্যের জ্যোতি:- সাধনার চূড়ান্ত স্তর হলো নূর। যখন কাম ও মামের/মায়ার মিলন প্রেমের আগুনে পুড়ে খাঁটি হয়, তখন সাধকের ভেতর খোদার নূর প্রকাশিত হয়।
** তাত্ত্বিক রহস্য:- এই স্তরে পৌঁছে সাধক আর নিজের ইচ্ছায় চলে না। তার ইচ্ছা তখন স্রষ্টার ইচ্ছায় বিলীন (Fana) হয়ে যায়। তখন তার দেখা হয় খোদার দেখা, তার বলা হয় খোদার বলা। রতি যখন মতির মাধ্যমে নূরে পরিণত হয়, তখন সাধক দীর্ঘায়ু এবং দিব্যজ্ঞান লাভ করেন।
** কোরআনিক নূর:- সূরা আন-নূরে বলা হয়েছে, “নূরুন আলা নূর” (জ্যোতির ওপর জ্যোতি)। সাধকের হৃদয়ে যখন এই নূর প্রজ্বলিত হয়, তখন সে দেহের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মহাজাগতিক সত্যকে প্রত্যক্ষ করে।
সর্বপরি, এখানে দেওয়া তত্ত্ব অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াটি একটি চক্রাকার আধ্যাত্মিক রসায়ন। কাম হলো- বীজ, মাম/মায়া- হলো মাটি ও পানি, প্রেম হলো- সেই বৃক্ষ যা রতিকে রস হিসেবে উর্ধ্বগামী করে এবং নূর হলো- সেই ফল যা মানুষকে অমরত্ব ও খোদার সান্নিধ্য দান করে। এটি-ই মূলত ‘আদম’ থেকে ‘ইনসানে কামেল’ বা পূর্ণ মানব হওয়ার পথ- আমিন >চলমান পাতা।














