ন্যায়বিচারের শক্তি
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) ছিলেন ন্যায়পরায়ণতা ও শাসন পরিচালনার এক মূর্ত প্রতীক। তিনি ছিলেন এতটাই বিনয়ী যে, একদিন তিনি মদীনায় নিজের হাতে একটি সাধারণ মাটির দেয়াল মেরামত করছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক ইহুদি ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে ফরিয়াদ জানাল। লোকটি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলল:
“হে আমীরুল মুমিনীন! বসরার গভর্নর আমার কাছ থেকে এক লক্ষ দিরহামের মালামাল কিনেছেন, কিন্তু এখন তিনি সেগুলোর মূল্য পরিশোধ করতে গড়িমসি করছেন।”
হযরত উমর (রাঃ) তার কথা শুনে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কি এই দেনার কোনো লিখিত কাগজ বা প্রমাণ আছে?” ইহুদি লোকটি হতাশ হয়ে বলল, “না, আমার কাছে কোনো কাগজ নেই।”
খলিফা উমর (রাঃ) তখন আশেপাশে তাকালেন এবং মাটি থেকে একটি ভাঙা মাটির পাত্রের টুকরো (খাপরা) কুড়িয়ে নিলেন। তিনি সেই মাটির টুকরোর ওপর লিখলেন:
“তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর সংখ্যা অনেক, কিন্তু তোমার কাজের কৃতজ্ঞতা স্বীকারকারীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। অভিযোগের কারণগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখো, অথবা শাসনের গদি থেকে নেমে যাও।”
চিঠির শেষে তিনি লিখলেন—‘ইতি, উমর ইবনুল খাত্তাব’।
এই চিঠিতে কোনো রাজকীয় সিলমোহর ছিল না, ছিল না কোনো আড়ম্বর। ছিল শুধু খলিফার হাতের লেখা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অটল অঙ্গীকার।
মাটির টুকরোর ক্ষমতা
ইহুদি লোকটি সেই মাটির টুকরো নিয়ে বসরার উদ্দেশে রওনা হলো। যখন সে বসরার শাসকের হাতে সেটি দিল, তখন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল।
বসরার শাসক তখন ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দূর থেকে লেখালেখিবিহীন একটি মাটির টুকরো দেখলেও, তাতে খলিফা উমর (রাঃ)-এর নাম ও হাতের লেখা দেখামাত্রই তাঁর শরীর ভয়ে কাঁপতে শুরু করল! তিনি তৎক্ষণাৎ ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন এবং সম্মানের আতিশয্যে মাটির সেই টুকরোটি চুম্বন করলেন।
ইহুদি ব্যক্তিটি তখনও ঘোড়ায় চড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বসরার শাসক মুহূর্ত বিলম্ব না করে সাথে সাথে তার সমস্ত পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করে দিলেন।
আল্লামা জামী (রহঃ) এই ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন:
“শাসকের সম্মান এবং কঠোর শাসনক্ষমতা যদি না থাকে, তবে তাকে বেয়াদব ও ধৃষ্ট লোকদের হাতে অপমানিত হতে হয়। যেমন, সিংহের যদি দাঁত ও নখ পড়ে যায়, তবে তাকে শেষ পর্যন্ত এক ল্যাংড়া শিয়ালের হাতেও থাপ্পড় খেতে হয়।”
হযরত উমর (রাঃ)-এর এই ঘটনা প্রমাণ করে, সত্যিকারের শাসনক্ষমতা রাজকীয় আড়ম্বরে নয়, বরং শাসকের ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যেই নিহিত থাকে।
শিক্ষা:
ন্যায়বিচারের সাথে কঠোরতা না থাকলে শাসন বেশি দিন টেকে না। শাসকের ক্ষমতা ও সম্মান তার নীতির দৃঢ়তা থেকেই আসে, কোনো সিলমোহর বা আড়ম্বর থেকে নয়।














