পালরাজ্যের শেষ অধ্যায়: অন্তর্দ্বন্দ্ব, বহিঃআক্রমণ ও এক মহাবংশের অবসান
রামপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্যের ইতিহাস যেন দ্রুত গড়িয়ে পড়তে থাকে অবক্ষয়ের পথে। তাঁর পুত্র কুমারপাল সিংহাসনে আরোহণ করলেও, কোন অধিকারে বা তিনি জ্যেষ্ঠ ছিলেন কি না—এ বিষয়ে ইতিহাস নীরব। কুমারপালের স্বল্প রাজত্বকালেই (আনু. ১১২০–১১২৫ খ্রি.) দক্ষিণবঙ্গে বিদ্রোহ দানা বাঁধে। এই সংকটকালে তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় অমাত্য বৈদ্যদেব নৌযুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন এবং পরে কামরূপে বিদ্রোহ দমন করে নিজেই সেই অঞ্চলের রাজা হন।
কুমারপালের মৃত্যুর পর বৈদ্যদেব কামরূপে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন—যা পালশক্তির দুর্বলতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কুমারপালের পর তাঁর পুত্র তৃতীয় গোপাল (আনু. ১১২৫–১১৪০ খ্রি.) সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর রাজত্বকাল ইতিহাসে প্রায় নিষ্প্রভ। বরং এই সময়েই পালরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ভাঙন ভয়াবহ আকার নেয়। পূর্ববঙ্গে বর্ম্মণ রাজারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, দক্ষিণ দিক থেকে গঙ্গবংশীয় রাজারা আক্রমণ শুরু করেন, আর পশ্চিমে দাক্ষিণাত্যের চালুক্য শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই বহুমুখী চাপের মধ্যেই রাঢ়দেশে সেনবংশ ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই অশান্ত সময়ের পর পালসিংহাসনে বসেন মদনপাল (আনু. ১১৪০–১১৫৫ খ্রি.)। চারদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি পালরাজ্য রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কখনো গাহড়বালদের হাত থেকে মুঙ্গের পুনরুদ্ধার, কখনো স্থানীয় শাসক গোবর্দ্ধনকে পরাজয়—এসব সাময়িক সাফল্য এলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে ছিল না। শেষ পর্যন্ত সেনবংশীয় বিজয় সেন গৌড় আক্রমণ করে পালরাজাকে পরাজিত করেন। শিলালিপির সাক্ষ্য অনুযায়ী, এই পরাজিত গৌড়রাজ ছিলেন স্বয়ং মদনপাল।
মদনপালের মৃত্যুর সময় পালরাজ্যের অবস্থা ছিল শোচনীয়। দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে যায়, এমনকি উত্তরবঙ্গের বড় অংশও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পালরাজ্য তখন কার্যত মগধ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।
মদনপালের পরে গয়ায় গোবিন্দপাল নামে এক বৌদ্ধ রাজা শাসন করেন। তিনি নিজেকে ‘গৌড়েশ্বর’ বললেও তাঁর প্রকৃত ক্ষমতা সীমিত ছিল। বৌদ্ধ পুঁথির সূত্রে জানা যায়, ১১৬২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রাজ্যের সম্পূর্ণ বিনাশ ঘটে। এই ঘটনাকেই বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সময় গণনার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করেন, কারণ গোবিন্দপালই ছিলেন মগধের শেষ বৌদ্ধ রাজা।
এইভাবেই ১১৬২ খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মপাল, দেবপাল, মহীপাল ও রামপালের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিতে গড়া পালরাজ্যের দীর্ঘ চারশো বছরের ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীকালে যাঁদের পাল উপাধিধারী রাজা বলা হয়, তাঁদের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে সন্দেহজনক বলেই মনে করেন অধিকাংশ গবেষক।

















