বর্ম্মরাজবংশ: পাল-পরবর্তী বাংলায় এক বিস্মৃত রাজশক্তির উত্থান ও অবসান
একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন পালরাজ্যের শক্তি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল, ঠিক সেই রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যেই পূর্ববঙ্গে আত্মপ্রকাশ করে এক নতুন রাজবংশ— বর্ম্মরাজবংশ। এই বংশের ইতিহাস জানার প্রধান অবলম্বন ঢাকা জেলার বেলাব গ্রাম থেকে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন, যা আমাদের সামনে এক বিস্ময়কর অথচ বিতর্কিত রাজবংশের ছবি তুলে ধরে।
বেলাব তাম্রশাসনের বংশপরিচয়ে পৌরাণিক ধারা অনুসরণ করে ব্রহ্মা থেকে শুরু করে অত্রি, চন্দ্র, বুধ, পুরূরবা, যযাতি ও যদু—এই দীর্ঘ যদুবংশের উল্লেখ আছে। এই বংশেই কৃষ্ণের জন্ম, এবং কৃষ্ণের জ্ঞাতি বলেই বর্ম্মবংশ নিজেদের পরিচয় দিয়েছে। বৈদিক ধর্মের পৃষ্ঠপোষক এই বংশ সিংহপুর নামক স্থানে রাজত্ব করত বলে শাসনে দাবি করা হয়েছে।
এই বংশের প্রথম উল্লেখযোগ্য শাসক বজ্রবর্ম্মা—যিনি বীর, কবি ও পণ্ডিত বলে প্রশস্তিতে বর্ণিত। তাঁর পুত্র জাতবর্ম্মা ছিলেন বর্ম্মরাজবংশের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী শাসক। প্রশস্তি অনুযায়ী তিনি অঙ্গদেশে কর্তৃত্ব স্থাপন করেন, কামরূপ জয় করেন, কৈবর্ত্তনায়ক দিব্য ও গোবর্দ্ধন নামক রাজাকে পরাজিত করেন এবং কলচুরি রাজ কর্ণের কন্যা বীরশ্রীকে বিবাহ করেন। তবে এগুলি প্রশস্তির অতিশয়োক্তি না কি ঐতিহাসিক সত্য—তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে।
আধুনিক গবেষকদের মতে, জাতবর্ম্মা সম্ভবত কলচুরি রাজ গাঙ্গেয়দেব ও কর্ণের অধীনস্থ সামন্তরাজ ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে পালরাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেন। এই সুযোগেই তিনি পূর্ববঙ্গে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। কেবলমাত্র সিংহপুরের মতো একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের অধিপতি হয়ে একক বাহুবলে অঙ্গ, কামরূপ ও বরেন্দ্র জয় করা বাস্তবসম্মত নয়—এই যুক্তিতেই এই অনুমান গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
সিংহপুর কোথায় অবস্থিত ছিল, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেউ পঞ্জাবের সিংহপুর, কেউ কলিঙ্গের সিংহপুর (বর্তমান সিঙ্গুপুরম), আবার কেউ রাঢ়দেশের সিঙ্গুরের সঙ্গে একে যুক্ত করেন। তবে কলিঙ্গে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সিংহপুর রাজ্যের অস্তিত্বের প্রমাণ থাকায় অনেকেই মনে করেন—জাতবর্ম্মা কলিঙ্গের সিংহপুরেরই অধিপতি ছিলেন।
জাতবর্ম্মার পরে রাজ্য পরিচালনার প্রশ্নে জটিলতা দেখা দেয়। বেলাব তাম্রশাসনে তাঁর পুত্র সামলবর্ম্মা-র নাম থাকলেও, বজ্রযোগিনী গ্রামে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসনের খণ্ডাংশ থেকে অনুমান করা যায় যে জাতবর্ম্মার পরে প্রথমে হরিবর্ম্মা রাজত্ব করেন। হরিবর্ম্মার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই—কারণ তাঁর রাজত্বের ১৯ ও ৩৯ বর্ষে লিখিত দুইটি বৌদ্ধ পুঁথি, সামন্তসার গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রশাসন এবং তাঁর মন্ত্রী ভবদেব ভট্টের শিলালিপি—সব মিলিয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা।
হরিবর্ম্মার রাজধানী সম্ভবত বিক্রমপুরে ছিল এবং তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী রাজত্ব করেন। ‘রামচরিত’-এ উল্লিখিত হরি নামক বর্ম্ম নরপতির সঙ্গে হরিবর্ম্মার অভিন্নতা থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হরিবর্ম্মার পর তাঁর পুত্রগণ রাজত্ব করলেও তাঁদের রাজ্যকাল সম্পর্কে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না।
এই সময়ে বর্ম্মরাজবংশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম হল ভবদেব ভট্ট—হরিবর্ম্মার মন্ত্রী ও বাংলার এক অসামান্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। সিদ্ধান্ত, তন্ত্র, জ্যোতিষ, ধর্মশাস্ত্র, মীমাংসা থেকে শুরু করে কবিকলা ও আয়ুর্বেদ—প্রায় সব শাস্ত্রেই তাঁর অসাধারণ দখল ছিল। তাঁর রচিত মীমাংসা ও স্মৃতিগ্রন্থ আজও সংস্কৃত সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা পায়।‘বালবলভীভুজঙ্গ’ উপাধির মধ্যেই তাঁর বাল্যকালীন মেধার কিংবদন্তি লুকিয়ে আছে।
হরিবর্ম্মার পরে পুনরায় সামলবর্ম্মা রাজা হন। কুলজী গ্রন্থ অনুযায়ী তাঁর আমন্ত্রণেই বৈদিক ব্রাহ্মণদের বাংলায় আগমন ঘটে (প্রায় ১০৭৯ খ্রিস্টাব্দ)। কিছু কুলজীতে এই কৃতিত্ব হরিবর্ম্মার বলেও উল্লেখ আছে। যাই হোক, বাংলায় বৈদিক ব্রাহ্মণ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ম্মরাজবংশের সঙ্গেই গভীরভাবে যুক্ত।
সামলবর্ম্মার পর তাঁর পুত্র ভোজবর্ম্মা রাজত্ব করেন। বিক্রমপুর থেকে প্রদত্ত বেলাব তাম্রশাসনে ভোজবর্ম্মাকে ‘পরমবৈষ্ণব’, ‘পরমেশ্বর’, ‘পরমভট্টারক’, ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে—যা ইঙ্গিত করে যে তিনি একজন স্বাধীন ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন। কিন্তু তাঁর পরেই বর্ম্মরাজবংশ ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে যায়। সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে সেনবংশীয় বিজয়সেন এই বংশের অবসান ঘটান।
এইভাবেই পাল-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বর্ম্মরাজবংশ এক সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে—যার বহু অংশ আজও অনুমান ও বিতর্কের আবরণে ঢাকা।

















