বিষধর সাপের ২০০ ছোবল খেয়েছেন
পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষ ও বিষধর সাপের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই প্রাণঘাতী সমস্যার এক অদ্ভুত ও দুঃসাহসী সমাধান নিয়ে কাজ করছেন টিম ফ্রিড নামের ৫৮ বছর বয়সী এক মার্কিন নাগরিক। একটি কার্যকর ও সর্বজনীন ‘অ্যান্টিভেনম’ বা সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির লক্ষ্যে তিনি নিজের শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে ২০০ বার বিষধর সাপের কামড় খেয়েছেন।
জানালা পরিষ্কারের কাজ করলেও টিমের নেশা ছিল বিজ্ঞান। গত ২০ বছর ধরে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক সব সাপের কামড় খেয়েছেন, যাতে তাঁর শরীরে এমন এক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘ইমিউনিটি’ তৈরি হয়, যা থেকে একদিন সর্বজনীন অ্যান্টিভেনম তৈরি করা সম্ভব হয়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে নিজ বাড়ির বেজমেন্টে এই বিপজ্জনক পরীক্ষা চালিয়েছেন তিনি।
টিমের এই আত্মত্যাগে এখন একটি নতুন ও কার্যকর অ্যান্টিভেনম তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৫ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং ৪ লাখ মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করে। তাঁদের অধিকাংশেরই বাস এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর দরিদ্র অঞ্চলে।

বর্তমানে সেন্টিভ্যাক্স নামে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন টিম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জ্যাকব গ্ল্যানভিল জানান, টিম এমন সব সাপের বিষ নিজের শরীরে নিয়েছেন, যা সাধারণ অবস্থায় একটি ঘোড়াকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। গত বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টিমের শরীরের অ্যান্টিবডিগুলো কোবরা, মাম্বা, তাইপান, ক্রেইটসহ ‘এলাপিডি’ পরিবারের ১৯টি বিষধর সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।
টিম ফ্রিডের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে। তখন তিনি বিষের সঙ্গে স্যালাইন মিশিয়ে শরীরে ইনজেকশন দিতেন এবং ধীরে ধীরে সরাসরি সাপের কামড় নিতে শুরু করেন। ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি এক ঘণ্টায় একটি ‘মনোকলড কোবরা’ ও একটি ‘ইজিপশিয়ান কোবরা’র কামড় খান। এর ফলে তিনি কোমায় চলে যান। টিম বলেন, ‘আমার প্রতিবেশী সময়মতো সাহায্য না করলে ১৫ মিনিটের মধ্যেই আমি মারা যেতাম। তবে আমি মৃত্যুর স্বাদ জানি—সেটা অন্ধকার ও শীতল।’
কোমা থেকে ফিরে এসেও টিম দমে যাননি। সাপের কামড়ের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি তাঁর পরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। একবার র্যাটলস্নেকের কামড়ে তাঁর আঙুল কালো হয়ে পচন ধরেছিল, আবার কোবরার বিষে তাঁর পায়ের পেশি ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল। টিম বলেন, ‘পেশিগুলো পা থেকে ফেটে বেরোচ্ছিল, আমাকে রেজারের ব্লেড দিয়ে তা কাটতে হয়েছিল। দুই মাস হাঁটতে পারিনি।’
টিমের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর সাপ ইনল্যান্ড তাইপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা। এই সাপের এক কামড়ের বিষ ১০০ জন মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। টিম এই সাপের কামড় খেয়েছেন মোট ২২ বার।
২০১৯ সাল থেকে সেন্টিভ্যাক্স টিমের রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করে অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ করছে। মানুষের শরীরে প্রয়োগের আগে এ বছর অস্ট্রেলিয়ায় পোষা প্রাণীদের ওপর এই অ্যান্টিভেনমের ট্রায়াল বা পরীক্ষা চালানো হবে।

















