ফজরের আযান পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি। জানালার বাইরে এখনো অন্ধকার, হালকা কুয়াশা জমে আছে চারপাশে। ঘরের ভেতর থেকেই শুনতে পেলাম মাইকে ভেসে আসছে সেই চিরচেনা সুর।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?
বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। কাল রাতেই আরিফের সঙ্গে কথা হয়েছে, সকালে শহীদ মিনারে যাবো। আমাদের বাসা থেকে শহীদ মিনার প্রায় ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে, তাই বাইক ছাড়া যাওয়া কঠিন। পাঞ্জাবিটা পরে এসে বাইকের চাবি তুলে নিলাম।
মা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি জুতো পরতে পরতে বললাম, মা, আমি বের হচ্ছি।
মা একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কিছু বললেন না, কিন্তু তার চোখের ভাষা বুঝতে পারলাম এমন দিনে যেন সবাই চুপচাপ হয়ে যায়।
গলির মাথায় গিয়ে দেখি, আরিফ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ফুলের স্তবক। ওর চোখে উত্তেজনা, কিন্তু মুখে যেন এক ধরনের ভাবলেশহীনতা। আমি বাইকের ইঞ্জিন চালু করতেই ও উঠে বসলো পেছনে।
সকালের পথঘাট বেশ ফাঁকা, তবে শহীদ মিনারের দিকে যেতে যেতে দেখলাম, অনেকেই দলবেঁধে হাঁটছে। কিছু পরিবার ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে, কেউ কেউ সাদা শাড়ির ওপর কালো ব্যাজ পরে ধীর পায়ে এগোচ্ছে। মনে হলো, সবাই যেন একটা নীরব শোকের নদীর স্রোতে ভেসে চলেছে।
শহীদ মিনারের কাছে পৌঁছে বাইক পার্ক করে আমরা নেমে পড়লাম। চারপাশে মানুষের ঢল, কারও চোখে অশ্রু, কেউ ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে স্মরণ করছে সেই বীরদের, যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল।
আমরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গিয়ে বেদিতে ফুল রাখলাম। মনে মনে বললাম, তোমাদের জন্যই আজ আমরা বাংলায় কথা বলতে পারছি। তোমাদের ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না।
আরিফ ফিসফিস করে বলল, কাইয়ুম, শুধু ফুল দিলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।
আমি চুপ করে ওর দিকে তাকালাম। সত্যিই তো! একদিনের জন্য শহীদ মিনারে ফুল দেয়া যথেষ্ট নয়। আমাদের বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা, মর্যাদা দেওয়া, শুদ্ধভাবে ব্যবহার করাই তো আসল দায়িত্ব।
ফুল দিয়ে বাইকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটা দিন নয়, এটা একটা প্রতিজ্ঞা। ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেটাই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

ইউ বি টিভি ডেস্ক