রিজিক মানে কেবল অর্থ-সম্পদ বা টাকা-পয়সা নয়; বরং মানুষের জীবন-উপকরণের প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাপ্তি, মানসিক প্রশান্তি, সুস্বাস্থ্য এবং সময়ের সদ্ব্যবহারই হলো রিজিক। মহান আল্লাহ কাউকে অঢেল দেন, আবার কারও রিজিক সীমিত করে দেন। তবে অনেক সময় আমাদের নিজস্ব কিছু ভুল এবং পাপাচারের কারণে অর্জিত রিজিকেও বরকত থাকে না।
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে যে ১০টি কারণে রিজিকের বরকত চলে যায়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. গুনাহ বা পাপাচারে লিপ্ত থাকা
রিজিক কমে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হলো পাপাচার। গুনাহের কারণে মানুষের ওপর অভাব-অনটন ও অসুস্থতা চেপে বসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার পাপকাজের দরুন তার প্রাপ্য রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০২২)। পাপাচার কেবল পরকাল নয়, দুনিয়ার বরকতও ধ্বংস করে দেয়।
২. হারাম উপায়ে উপার্জন
স্রষ্টার নির্দেশ অমান্য করে হারাম পথে টাকা আয় করলে সেই সম্পদে কখনোই শান্তি আসে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করে, সে এমন ব্যক্তির মতো—যে আহার করেও তৃপ্ত হয় না।’ (সহিহ্ মুসলিম: ১০৫২)। হারাম উপার্জন মানুষের ইবাদত কবুলের পথেও বড় অন্তরায়।
৩. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করা
অকৃতজ্ঞতা নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়ার অন্যতম কারণ। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে মনে রেখো, আমার শাস্তি বড়ই কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)। প্রাপ্ত নেয়ামতের অবজ্ঞা করলে রিজিক সংকুচিত হয়ে যায়।
৪. সুদ ও সুদের কারবার
রিজিক ও বরকত ধ্বংসের অন্যতম বড় কারণ হলো সুদ। বাহ্যিকভাবে সুদে সম্পদ বাড়ছে মনে হলেও আধ্যাত্মিকভাবে তা সম্পদকে ধ্বংস করে দেয়। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৬)। সুদখোর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়।
৫. জাকাত আদায় না করা
জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জাকাত দেয় না, তাদের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। হাদিসে এসেছে, ‘যারা জাকাত বন্ধ করে দেয়, তাদের জন্য আসমান থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)। জাকাত সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করে।
৬. অহংকার ও আত্মমুগ্ধতা
নিজের যোগ্যতা বা মেধার অহংকার করলে আল্লাহ রহমত তুলে নেন। কারুনের ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় ধ্বংসাত্মক—অত্যধিক কৃপণতা, প্রবৃত্তির অনুসরণ এবং নিজেকে নিয়ে মুগ্ধতা।’ (শুআবুল ইমান)। বিনয় বরকত বাড়ায়, আর অহংকার বরকত কেড়ে নেয়।
৭. আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীনতা
যখন মুমিন দুনিয়ার মোহে পড়ে আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন তার রিজিক থেকে বরকত উঠে যায়। উদাসীনতার ফলে মনে অহেতুক বাসনা তৈরি হয়, যা গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।’ (সুরা মুনাফিকুন: ৯)।
৮. মিথ্যা কসম ও ধোঁকাবাজি
ব্যবসা-বাণিজ্যে অধিক লাভের আশায় মিথ্যা কসম খেলে বা ক্রেতাকে ধোঁকা দিলে বরকত চলে যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, মিথ্যা কসমের দ্বারা বিক্রি বেশি হয় বটে, কিন্তু বরকত ধ্বংস হয়ে যায়। (সহিহ্ মুসলিম: ১৬০৭)। সততা ব্যবসায় বরকতের চাবিকাঠি।
৯. ব্যভিচার ও অশ্লীলতা
ব্যভিচার ও অশ্লীলতা কোনো সমাজে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অভাব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন যে, যে জাতির মাঝে ব্যভিচার বিস্তার লাভ করে, তাদের দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে পাকড়াও করা হয়। (মুসনাদে আহমদ)।
১০. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে যেমন রিজিক বাড়ে, তেমনি তা ছিন্ন করলে রিজিকে সংকীর্ণতা আসে। হাদিসে বারবার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার মাধ্যমে রিজিক ও আয়ু বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
রিজিকে বরকত লাভের উপায় কী?
রিজিকে বরকত পেতে হলে প্রথমে প্রয়োজন তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আর যদি জনপদগুলোর অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ: ৯৬)
রিজিক কেবল টাকার অঙ্কে পরিমাপযোগ্য নয়। অল্প সম্পদে তৃপ্তি ও শান্তি থাকাই হলো প্রকৃত বরকত। তাই আমাদের উচিত যাবতীয় গুনাহ বর্জন করে হালাল পথে চলা এবং সর্বদা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক 