লেমুয়া ইউনিয়নে রাজনৈতিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
ফেনী সদর উপজেলার ৯ নম্বর লেমুয়া ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্যাতন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ তুলে স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর দাবি, বিগত সরকারের সময় একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর চালানো হয়েছে দমন-পীড়ন, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার এবং সহিংসতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশারফ হোসেন নাসিমের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে ওঠে, যারা পুরো ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী নুরুল আমিন এবং যুবলীগ নেতা শংকর শীল এ কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি করে প্রশাসনের কাছে সরবরাহ করা হতো এবং সেই অনুযায়ী চালানো হতো অভিযান। এসব অভিযানে অনেক নিরীহ মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি ও দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন।
বিশেষ করে শংকর শীলকে কেন্দ্র করে নানা গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বিরোধেও মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়াতেন। সামান্য বিষয়েও মারধর, হামলা ও মামলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, ফলে পুরো ইউনিয়নে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
২০১৩-২০১৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ভাঙ্গার তাকিয়া এলাকায় একটি অবস্থান কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিয়মিত মহড়া দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফেনীগামী বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের আটক করে মারধর এবং পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সন্ধ্যার পর বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হতো। এসব অভিযানে কাউকে না পেলে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এসব ঘটনায় শংকর শীলসহ তার সহযোগী পঙ্কজ, আজাদ, দাউদ ও সমীরকে অস্ত্রসহ দেখা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শংকর শীলের কাছে একটি শটগান ও পিস্তল ছিল, যা তৎকালীন চেয়ারম্যানের অস্ত্র বলে ধারণা করা হয়। গত ৫ আগস্টের পর চেয়ারম্যান এলাকা ত্যাগ করলেও এসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ফেনীতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনাতেও শংকর শীলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেদিন তাকে অস্ত্রসহ দেখা গেছে।
অন্যদিকে, শংকর শীলের ভাই দীপঙ্কর শীলকে নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফেনী পৌরসভায় অস্থায়ী চাকরি হারানোর পর নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দিয়ে পুনরায় চাকরিতে বহাল হন এবং প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশের কথা প্রচার করেন। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা এসব দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
লেমুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি সভাপতি ফেরদৌস কোরাইশি, সাবেক যুবদল নেতা নিজাম উদ্দিন, সাবেক কৃষক দল নেতা মহিউদ্দিন এবং বর্তমান কৃষক দল সভাপতি সুজল হকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জরুরি পদক্ষেপ এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এলাকাবাসীর মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে লেমুয়া ইউনিয়নে যে কোনো সময় বড় ধরনের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

মোহাম্মদ হানিফ ফেনী জেলা সংবাদদাতা