প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২

ভবদহে জলাবদ্ধতায় আবারও থমকে বোরো আবাদ: ৭ হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর, উজ্জ্বল বাংলাদেশ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না ভবদহ অঞ্চলে। গত বর্ষার অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর নাব্যতা সংকটের প্রভাবে এবারও বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে বোরো ধানের আবাদ সম্ভব হয়নি। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার ভবদহ অঞ্চলে মোট ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমি এবার অনাবাদি রয়ে গেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় কিছু বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে, তবে বাস্তবে বিলের বড় অংশ এখনো পানির নিচে।
ভবদহ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত যশোরের মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে বিস্তৃত এ জলাভূমি। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৫২টি বিল রয়েছে। এসব বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে মুক্তেশ্বরী নদী, টেকা নদী, শ্রী নদী ও হরি নদী–এর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না এবং বিল উপচে আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়।
গত বর্ষায় ভারী বৃষ্টিপাতে মনিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলার বিলসংলগ্ন বহু গ্রাম পানির নিচে চলে যায়। বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, রাস্তাঘাট ও মাছের ঘের প্লাবিত হয়। স্থানীয়দের হিসাবে, দুই লাখেরও বেশি মানুষ দীর্ঘ সময় পানিবন্দী অবস্থায় দুর্ভোগে পড়েন। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড শ্রী ও হরি নদীতে পরীক্ষামূলক চ্যানেল কেটে পানি নামানোর উদ্যোগ নেয়। এতে গ্রামাঞ্চলের পানি কিছুটা নেমে গেলেও অধিকাংশ বিল এখনো জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভবদহ অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার কৃষক রয়েছেন এবং স্বাভাবিক বছরে তিন উপজেলায় মোট ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। এর মধ্যে মনিরামপুরে ১২ হাজার ১০৪ হেক্টর, অভয়নগরে ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর এবং কেশবপুরে ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি রয়েছে। এবার মোট ১৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ৪ হেক্টর বেশি। তবে জলাবদ্ধতার কারণে ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্ভব হয়নি। উপজেলা ভিত্তিক হিসাবে অভয়নগরে ১ হাজার ২৯০ হেক্টর, কেশবপুরে ২ হাজার ১৩০ হেক্টর এবং মনিরামপুরে ৩ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি অনাবাদি রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিল বোকড়, বিল কেদারিয়া, বিল কপালিয়া, বিল ডুমুর, বিল ঝিকরা, বিল গান্ধীমারি, বিল গজালমারি ও বিল পায়রা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোমরসমান আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে আছে। কোনো কোনো স্থানে পাঁচ থেকে সাত ফুট গভীর জল রয়েছে। কিছু উঁচু জমিতে কৃষকেরা অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে সেচযন্ত্রের সাহায্যে পানি সরিয়ে সীমিত আকারে বোরো চাষ করেছেন, তবে অধিকাংশ নিচু জমি এখনো অনাবাদি। পানির ওপর ভাসছে আগাছা, কচুরিপানা ও শাপলা।
মনিরামপুর উপজেলার একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, বিলের উঁচু অংশে কিছুটা চাষ করা গেলেও নিচু জমিতে এখনো পানি নামেনি। ফলে জমি পড়ে থাকছে এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেই ব্যক্তিগত খরচে সেচযন্ত্র ব্যবহার করে পানি সরানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু গভীর জলাবদ্ধতায় তা পর্যাপ্ত নয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকেরা ছোট বিলগুলো সেচের মাধ্যমে আবাদে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছেন। তবে পুনঃখননের জন্য নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ায় শেষ সময়ে পানি নিষ্কাশন বিলম্বিত হয়েছে। অন্যদিকে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা দাবি করছেন, কৃষি বিভাগের উপস্থাপিত অনাবাদি জমির পরিমাণ বাস্তবতার চেয়ে কম দেখানো হয়েছে এবং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদী পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে এবং স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিকাংশ পানি নামানো সম্ভব হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিমত, ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, কার্যকর ড্রেজিং, সঠিক স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত পানি নিষ্কাশন পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিবছরই এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে। এতে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিষ্ঠাতা, ক্যাপশন নিউজ এবং ভিডিও এডিটরঃ মো: রাজিবুল করিম রোমিও, এম, এস, এস (সমাজ কর্ম-রাজশাহী), প্রধান উপদেষ্টাঃ মো: সাদেকুল ইসলাম (কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠক), উপদেষ্টাঃ মো: মাহিদুল হাসান সরকার, প্রকাশকঃ কামরুন নেছা তানিয়া, সম্পাদকঃ মো: আ: হান্নান মিলন, সহকারী সম্পাদকঃ রুবিনা শেখ, ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: আব্দুল আজিজ, বার্তা সম্পাদকঃ মো: মিজানুর সরকার

প্রিন্ট করুন