মদীনার রাজপথ। সাহাবী মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) আনমনে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল কুরাইশ বংশের দুজন ব্যক্তি অত্যন্ত চমৎকার ও দামী পোশাকে সজ্জিত হয়ে যাচ্ছেন। কৌতূহলবশত তিনি জানতে পারলেন—এই দামী পোশাকগুলো খলিফা উমর (রা.) নিজেই তাঁদের উপহার দিয়েছেন।
এর কিছুক্ষণ পরেই তাঁর দেখা হলো একজন আনসারী সাহাবীর সঙ্গে। তাঁর পরনের পোশাকটি ছিল অনেক সাধারণ ও নিম্নমানের। অথচ তাঁকেও খলিফা নিজেই এই পোশাক দিয়েছিলেন।
১. রাসূলের ﷺ সতর্কবাণী ও সাহাবীর তাকবীর
এই দৃশ্য দেখে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)-এর বুক কেঁপে উঠল। তাঁর মনে পড়ে গেল নবীজি ﷺ-এর সেই হুঁশিয়ারি— “আমার পর তোমরা পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্য দেখতে পাবে।” তাঁর ভয় হলো, তবে কি ইনসাফের মূর্ত প্রতীক উমরের হাত ধরেই এই বৈষম্যের শুরু হচ্ছে?
ব্যথিত হৃদয়ে তিনি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে উচ্চস্বরে তাকবীর দিয়ে উঠলেন— “আল্লাহু আকবার! সাদাকাল্লাহু ওয়া রাসূলুহু!” (আল্লাহ মহান! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন!)
২. খলিফার অস্থিরতা ও সেই মুখোমুখি সাক্ষাত
মসজিদের ভেতর এমন গম্ভীর তাকবীর শুনে খলিফা উমর (রা.) বিচলিত হলেন। তিনি লোক পাঠিয়ে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.)-কে ডেকে পাঠালেন। এমনকি উমর (রা.) নিজে অস্থির হয়ে তাঁর পাশে এসে বসলেন। নামাজ শেষ হতেই খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, “হে ইবনে মাসলামা! আজ এই মসজিদে এমন উচ্চস্বরে তাকবীর দেওয়ার কারণ কী?”
৩. সাহসিকতার সাথে সত্য প্রকাশ
মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সরাসরি বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন! পথে দেখলাম আপনি কুরাইশদের দামী পোশাক দিয়েছেন, অথচ আনসারীকে দিয়েছেন নিম্নমানের পোশাক। রাসূলের ﷺ সতর্কবাণী অনুযায়ী আমি কি ধরে নেব যে আপনার হাত দিয়েই বৈষম্যের শুরু হচ্ছে? আমি চাইনি আপনি এই ভুলের পথে পা বাড়ান।”
৪. অশ্রুসিক্ত তওবা ও আত্মসংশোধন
একথা শোনামাত্রই অর্ধ-জাহানের প্রতাপশালী খলিফা উমর (রা.)-এর শরীর কাঁপতে লাগল। তিনি কোনো যুক্তি দিলেন না, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করলেন না। বরং শিশুর মতো অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তাঁর চোখের পানিতে দাড়ি ভিজে একাকার হয়ে গেল। তিনি কাঁপা কণ্ঠে বললেন—
“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি। এমনটি আর কখনো হবে না। আমি ভুল করেছি।”
সেই দিনের পর থেকে হযরত উমর (রা.) আর কোনোদিন কুরাইশদের আনসারদের ওপর বিন্দুমাত্র প্রাধান্য দেননি। তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, খলিফা হলেও তিনি সত্যের অধীন।
গল্পের শিক্ষা:
ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সাহস: সাহাবীদের যুগে সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রপ্রধানের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখতেন এবং এটিকেই তাঁরা ঈমানি দায়িত্ব মনে করতেন।
বিনয় ও মহত্ত্ব: উমর (রা.)-এর চরিত্র আমাদের শেখায়—সত্য সামনে আসামাত্র দম্ভ ত্যাগ করে তা গ্রহণ করাই হলো প্রকৃত শক্তি।
উপহার হিসেবে সমালোচনা: উমর (রা.) বলতেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যে আমার ভুলগুলো আমাকে উপহার হিসেবে দেয়।”

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক