মানবজাতির ঊষালগ্নে, যখন পৃথিবী ছিল এক শান্ত ও জনবিরল স্থান, তখন আদি পিতা হজরত আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল এক গভীর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেন। কোনোভাবেই যখন মীমাংসা হচ্ছিল না, তখন আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাদের এক অভিনব পরীক্ষার কথা জানালেন। তিনি বললেন, “তোমরা উভয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানি কবুল হবে, সত্য তার পক্ষেই থাকবে।”
এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন। (সুরা মায়িদা: ২৭)
সেই যুগে কোরবানি কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল অলৌকিক। নিয়ম ছিল, কোরবানির বস্তু নির্জন খোলা জায়গায় রেখে আসতে হতো। যদি আকাশ থেকে আগুনের একটি শিখা এসে সেই বস্তুটি ভস্মীভূত করে দিত, তবে বোঝা যেত যে কোরবানি কবুল হয়েছে।
হাবিল ও কাবিলের প্রস্তুতি
দুই ভাই তাদের নিজ নিজ পেশা থেকে কোরবানির সামগ্রী নিয়ে পাহাড়ের ওপর উপস্থিত হলেন।
হাবিল: তিনি ছিলেন পশুপালক। তাঁর মনে ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও তাকওয়া। তিনি তাঁর পালের সবচেয়ে সুস্থ, সবল এবং উৎকৃষ্ট দুম্বাটি কোরবানির জন্য বেছে নিলেন।
কাবিল: তিনি ছিলেন কৃষক। কিন্তু তাঁর মনে ছিল কৃপণতা ও অহংকার। তিনি নিজের খেত থেকে সবচেয়ে নিম্নমানের, পোকাধরা গমের কিছু শীষ নিয়ে কোরবানির জন্য পেশ করলেন।
আসমানি ফয়সালা ও কাবিলের ক্রোধ
উভয়ে পাহাড়ের ওপর তাদের উপহার রেখে দূরে অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ আকাশের বুক চিরে এক জ্যোতির্ময় অগ্নিশিখা নেমে এল এবং মুহূর্তের মধ্যে হাবিলের দুম্বাটিকে ভস্মীভূত করে দিল। অর্থাৎ হাবিলের কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হলো। অন্যদিকে কাবিলের গমের আটিটি অবিকল আগের মতোই পড়ে রইল; তা প্রত্যাখ্যাত হলো।
নিজের পরাজয় দেখে কাবিলের মনে হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলল, “আমি অবশ্যই তোমায় হত্যা করব!”
হাবিলের শান্ত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর
ভাইয়ের এমন হুংকার শুনেও হাবিল বিচলিত হলেন না। তিনি অত্যন্ত কোমল ও নীতিগত সুরে বললেন:
“আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকি বা সংযমীদের কোরবানিই কবুল করেন। তুমি যদি তাকওয়া অবলম্বন করতে, তবে তোমার কোরবানিও গৃহীত হতো। এতে আমার তো কোনো দোষ নেই।”
হাবিল আরও বললেন যে, কাবিল যদি তাকে মারতেও আসে, তিনি পাল্টা আঘাত করবেন না, কারণ তিনি বিশ্বজগতের পালনকর্তাকে ভয় করেন। কিন্তু কাবিল তার মনের কালিমা মুছতে পারল না। হিংসা তাকে এতটাই অন্ধ করে দিল যে, শেষ পর্যন্ত সে তার আপন ভাইকে হত্যা করে ফেলল।
ইতিহাসের শিক্ষা: মনের স্বচ্ছতা
হাবিলের সেই উৎসর্গ করা দুম্বাটি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তা জান্নাতে বিচরণ করতে থাকে এবং হাজার বছর পর হজরত ইসমাইল (আ.)-কে রক্ষার জন্য সেই দুম্বাটিই ফিদয়া হিসেবে প্রেরিত হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন— “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানি নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুস্পদ জন্তু জবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাকো এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।” (সুরা হজ:৩৪)
গল্পের শিক্ষা:
১. তাকওয়াই মূল: আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার মনের স্বচ্ছতা এবং তাকওয়া। হাবিল শ্রেষ্ঠ জিনিস দিয়েছিলেন ভালোবাসা থেকে, আর কাবিল দিয়েছিল অবহেলা থেকে। ২. হিংসার পরিণতি: হিংসা মানুষকে অন্ধ করে দেয় এবং তা প্রথম মানব হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৩. ইখলাস বা নিষ্ঠা: লোকদেখানো কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোরবানি কবুলের প্রধান শর্ত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রবল ইচ্ছা।

উজ্জ্বল বাংলাদেশ ডেস্ক